যে বছর (২০২৩) আমি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শর্টফিল্ম সেকশনের জুরি সদস্য হিসেবে গেলাম, সেবার জুরি প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইতালিয়ান ফিল্মমেকার জর্জ কুগনো। তাঁর নির্মিত ‘অ্যালেন ফুড’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে সে রটার্ডাম, কার্লোভী ভ্যারিসহ দুনিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে ঘুরে বেড়ান। স্বভাবতই ফেস্টিভ্যাল সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা রয়েছে, আমাদের দুজনের তুমুল আড্ডায় সে বিষয়গুলো উঠে আসে। জর্জ একবার কথায় কথায় বললো, ফেস্টিভ্যাল মূলত প্রোমোশন চায়, কারণ প্রমোশনের সঙ্গে ফেস্টিভ্যালের বিজনেস জড়িয়ে আছে, সেক্ষেত্রে ছবি সিলেকশনের জন্য ওয়ার্ল্ড সেলস্ এজেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি এ নিয়ে কথা না বললেও থিয়েরি ফ্রেমোকে নিয়ে করা ভ্যারাইটির ফিচারে বেশ খোলামেলাভাবেই কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবি সিলেকশনের বিষয়টি উঠে এসেছে। ফিচারটি পড়তে পড়তে আমি আমার ফেলো ফিল্মমেকারদের সঙ্গে ফিচারটি শেয়ার করার তাগিদ অনুভব করি। সেখান থেকেই অনুবাদ করার ইচ্ছে জাগে, যদিও লেখাটি সেই অর্থে লিও ব্যারাক্লাফের করা ফিচারের অনুবাদ না, অনেকটা ভাবানুবাদ এবং সংক্ষেপিত।
রেড সি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এ বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান থিয়েরি ফ্রেমো তার ডকুমেন্টারি “লুমিয়ের! দ্য অ্যাডভেঞ্চার কন্টিনিউস” নিয়ে হাজির হয়েছেন। সেই সুবাদে, চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত উৎসবটিতে ফ্রেমো সাংবাদিক এবং ফিল্ম ক্রিটিকদের মুখোমুখি হন, তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় আবেগপ্রবণ ওঠেন। তাঁর বক্তব্যে চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা ফুটে ওঠে। তিনি জোর দিয়েই বলেন “যদি তুমি চলচ্চিত্রকে ভালোবাসো, চলচ্চিত্রও তোমাকে ভালোবাসবে”।
বিশ্বের বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য “ভাল চলচ্চিত্র” কী এ নিয়েও ফ্রেমো কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘ভালো চলচ্চিত্র কী’ এর দুইরকম জবাব হতে পারে বলে আমি মনে করি। প্রথমটি হল, আপনার চলচ্চিত্রের টেস্ট কেমন এবং অবশ্যই আপনার ভালো টেস্ট থাকতে হবে, যা আমার আছে’ তিনি মুচকি হেসে দেন, তাঁর সেন্স অব হিউমারে উপস্থিত সবার মধ্যে হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
“দ্বিতীয় উত্তরটি হল, ঠিক যা আমরা কান উৎসবে করি। এটা এমন না যে, এই চলচ্চিত্রটা ভাল, ঐ চলচ্চিত্রটা খারাপ। এই ছবির বক্তব্যটা আমার ভালো লেগেছে কিংবা অমুক চলচ্চিত্রটা আমি নিতে পারছি না, বিষয়গুলো আসলে এমন না। বিষয়টা হল: এই চলচ্চিত্রটি কানে জেতার যোগ্য কি না? চলচ্চিত্রটি দেখালে আমাদের উৎসবের কী ফায়দা হবে? কখনও কখনও এমন অনেক চলচ্চিত্র থাকে যা ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগে, কিন্তু সেই চলচ্চিত্রগুলো আবার কানের জন্য উপযুক্ত না, আমিতো আমার উৎসবের ভালোটা দেখবো। কিন্তু ঐ চলচ্চিত্রগুলো খারাপ, কিংবা সেগুলি আমি পছন্দ করছি না বলে সিলেক্ট করছি না, তা না। সবসময় বিবেচনায় রাখি, কানের জন্য যে নির্দিষ্ট ধরনের সিনেমা দেখানো উচিত, সেগুলোকেই গুরুত্বের দিক থেকে এগিয়ে রাখা।” ফ্রেমো আরেকটু যোগ করেন, “কান হল এক বছরের একটি বিশাল ফটোগ্রাফ, যা চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে। তাই, কিছু চলচ্চিত্র হয়তো আমার টেস্টের না, কিন্তু সেই চলচ্চিত্রগুলো সিলেক্ট করা জরুরি হয়ে পড়ে কারণ তা সমসাময়িক চলচ্চিত্রের ধারণা দেয়।”
ফ্রেমো, ১৯৭৯ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন, সেই বছর “অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ” প্রদর্শিত হয়েছিল। তিনি তখন কোনো এক্রিডিটেশন ছাড়াই গাড়ি চালিয়ে কানে যেতেন, আর রাতে গাড়িতেই ঘুমাতেন। তিনি বলেন, “যদিও ওই বছর আমি কোনো চলচ্চিত্র দেখিনি, তবুও আমি সেখানে ছিলাম। কারণ আমি সবসময়ই চলচ্চিত্রের অংশ হতে চেয়েছি।” হাসতে হাসতে ফ্রেমো জানান, যখন তাঁর বয়স ৮০ হবে, তখনও তিনি খুশি মনে তার স্থানীয় সিনেমা হলের বক্স অফিসে বসে দর্শকদের টিকিট দেওয়ার কাজ করতে পারবেন, এতে তাঁর কোন আপত্তি থাকবে না।
ফ্রেমো আসলে কখন সিনেমাপ্রেমী বা ফিল্ম বাফ হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে, ফ্রেমো বলেন, “যখন আপনি চলচ্চিত্র সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে নির্মাতাকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন, অভিনেতাকে নিয়ে নয়, তখন বুঝবেন আপনি সিনেমাপ্রেমী, কারণ চলচ্চিত্রটা হলো নির্মাতার, এটা জন ফোর্ডের বিষয়, জন ওয়েনের বিষয়ও না, এটা মার্টিন স্কর্সেজির বিষয়, রবার্ট ডি নিরোর না। যদিও জন ওয়েন এবং রবার্ট ডি নিরো অসাধারণ। এবং এই জার্নির ভিতর দিয়েই, আপনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রকে বিশেষ কিছু ভাবতে শুরু করবেন, আমিও এভাবে একসময় ফিল করতে শুরু করলাম চলচ্চিত্রই হবে আমার জীবনের বিষয়।”
তাঁর আলোচনায় কানের সার্বজনীন আবেদন এবং এর চরিত্রের প্রসঙ্গও চলে আসে। তিনি বলেন “এটা আমাদের কিংবা আমার উৎসবও না; কান হল আপনার উৎসব। কান কোনও ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসব না। সোজা কথায় এটা একটা বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসব যা ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয়। ফ্রেমো এক্ষেত্রে ভালো চলচ্চিত্র নির্বাচন করার চাপ নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা যখন এখানে চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলছি, তখন অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা তাদের চলচ্চিত্র শুটিং বা এডিটিং করছেন, আর আমি এখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। কেউ পরিচিত, কেউ অপরিচিত, কিংবা সারপ্রাইজিং কিছু অথবা হতাশা, আমরা আসলে প্রতিটা বছর একই অভিজ্ঞতা ভিতর দিয়ে যাই।”
তিনি বলেন, কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনের সবগুলো ছবি তিনি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে দেখেন। “আমরা সবকিছুতেই সমান মনোযোগ দিই, আপনার চলচ্চিত্র যেখানেই থাকুক না কেন, প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগিতার বাইরে, মিডনাইট স্ক্রিনিং অথবা অন্য কোন সেকশনে। তবে কিছু চলচ্চিত্র আলাদাভাবে চোখে পড়ে। ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ ছবিটার কথাই বলি, করালি ফার্জাতের ছবি, ডেমি মুরে ছবিটিতে অভিনয় করেছেন। এটা একটা বডি হরর ফিল্ম। এটা একটা জনরা ফিল্ম। ভালো হতো চলচ্চিত্রটিকে মিডনাইট স্ক্রিনিংএ রাখা, কিন্তু চলচ্চিত্রটির মধ্যে আলাদা কিছু বিষয় ছিল, বিশেষত এর নির্মাণের ধরন, কারণ কোনো জনরা ফিল্ম খুব ভালভাবে নির্মিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। যদি তা না হয়, তবে তাতে কোনো আগ্রহ থাকে না। তাই আমরা এটাকে প্রতিযোগিতায় রেখেছিলাম এবং ঠিকঠাক কাজ করেছে। এমনকি চলচ্চিত্রটি দেখার আগে বেশ কয়েকজন প্রযোজক ছবিটি নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। আমি তাঁদের আশ্বস্ত করে বললাম, ছবিটা খুবই ভালো । তারা বললেন, ‘আপনি নিশ্চিত?’ আমি বললাম ‘নিশ্চয়ই, আস্থা রাখেন।’ এখন ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বক্স অফিস আয় করেছে এবং এটি এখন অ্যাকাডেমি পুরস্কারের জন্য ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। আসলে আমি এটা কীভাবে জানতাম? কারণ আমার চলচ্চিত্র টেস্ট ভালো। যদিও চলচ্চিত্রটি আমার টেস্টের ছিল না, তবে চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমার জানাশোনা, এবং চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রতি আমার যে দরদ, এসব জায়গা থেকেই আমার জন্য বুঝতে সহজ হয়েছে, এর বাইরে জর্জ রোমেরো ছিল আমার পছন্দের নির্মাতা। আসলে কান চলচ্চিত্র উৎসবে একদম অহেতুক, মানহীন কোন চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় না।”
ফ্রেমো ২০২২ সালে ‘টপ গান: মেভেরিক’ ছবির সিলেকশন নিয়েও কথা বলেন। “এটা তো একটা ভালো ছবি। ছবিটি তৈরির উদ্দেশ্যেও তো খুব ভালো এবং ছবির ফলাফল দেখেন, সেটাও ভালো। এক্ষেত্রে টম ক্রুজ নিজেও কান চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থিত থাকায় ভয়ে ছিলেন, যদি ছবিটি ভালো না হয়! এবং অবশ্যই, কখনও কখনও আমাদেরও ভুল হতে পারে। আর এজন্য আমিও খুব কঠোর থাকি, কারণ এটা আমাদের জন্যও চ্যালেঞ্জের, সিলেক্টেড ছবি ভালো না হলে দর্শক বিরক্ত হবে, আমাদের সিলেকশন নিয়ে তাঁরা সংশয় প্রকাশ করবে। কারণ আমাদের দর্শকেরা অত্যন্ত ডিমান্ডিং এবং সেনসেটিভ, যদিও আমি কনফেস করেই বলসি অতীতে আমাদের কিছু ভুল হয়েছে।”
ফিল্ম ক্রিটিকদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফ্রেমো বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানের কারণে ফিল্ম ক্রিটিকদের আগের মতো অবস্থান নেই এবং তাঁদের সেই জৌলুশও হারিয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, ফিল্ম ক্রিটিকদের সাপোর্ট দেয়া আমাদের জরুরি, আপনাকে অবশ্যই ফিল্ম ক্রিটিকদের লেখা পড়তে হবে, আপনি তাদের সঙ্গে একমত হন বা না হন।”
এক্ষেত্রে ফ্রেমো আরেকটু যোগ করেন “সময় হল সবচেয়ে বড় ক্রিটিক, অন্যান্য মহান শিল্পীদের মতো কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতাও তাদের নিজের জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাবেন না। আপনারা জানেন মোজার্ট প্রায় অজ্ঞাত অবস্থায় মারা গেছেন। ভ্যান গঘ জীবদ্দশায় কখনও আজকের মতো খ্যাতি পাননি। তাই সময়ই সেরা ক্রিটিক, হয়তো যে বিষয়টি এখন কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, তা এক শতাব্দী পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং সমসাময়িক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও ঘটনাটা একই।”
যুবরাজ শামীম, চলচ্চিত্র নির্মাতা









