একজন শুক্রাণু দাতা নিজেও জানতেন না যে তার দেহে এমন একটি জিনগত পরিবর্তন (মিউটেশন) আছে যা ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়— তার শুক্রাণু ব্যবহার করে ইউরোপজুড়ে অন্তত ১৯৭টি সন্তানের জন্ম হয়েছে। বড় ধরনের এক অনুসন্ধানে এই তথ্য জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) এক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা যায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি থেকে।
কিছু শিশু ইতোমধ্যেই মারা গেছে এবং যারা এই জিনগত পরিবর্তন (মিউটেশন) উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই ক্যান্সার এড়াতে পারবে। এই শুক্রাণু যুক্তরাজ্যের কোনো ক্লিনিকে বিক্রি করা হয়নি। তবে বিবিসি নিশ্চিত হয়েছে যে, খুব অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ পরিবার (যাদের ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে) ডেনমার্কে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার সময় ওই দাতার শুক্রাণু ব্যবহার করেছিলেন।
শুক্রাণুটি বিক্রি করেছিল ডেনমার্কের যেই ইউরোপিয়ান স্পার্ম ব্যাংক, সেটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি তাদের ‘গভীর সহানুভূতি’ রয়েছে এবং স্বীকার করেছে যে কিছু দেশে ওই দাতার শুক্রাণু দিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে। ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়নের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবিসিসহ ১৪টি পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টার এই অনুসন্ধান যৌথভাবে পরিচালনা করেছে।
অজ্ঞাত পরিচয়ের একজনের কাছ থেকে শুক্রাণুটি নেওয়া হয়েছিলো। যিনি ২০০৫ সালে ছাত্র থাকা অবস্থায় অর্থের বিনিময়ে শুক্রাণু দান শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে প্রায় ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন নারী তার শুক্রাণু ব্যবহার করেছেন। তিনি সুস্থ ছিলেন এবং দাতা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব স্ক্রিনিং পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। তবে জন্মের আগেই তার কিছু কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটেছিল।
এই পরিবর্তন টিপি-ফাইভ থ্রি জিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—যে জিনের মূল কাজ হলো দেহের কোষগুলোকে ক্যান্সারে রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করা। দাতার শরীরের বেশিরভাগ অংশে বিপজ্জনক টিপি-ফাইভ থ্রি জিন নেই, কিন্তু তার প্রায় ২০ শতাংশ শুক্রাণুতে এটি রয়েছে।
তবে, এই আক্রান্ত শুক্রাণু দিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর প্রতিটি কোষেই এই জিনগত পরিবর্তন থাকবে। এ অবস্থাকে লি-ফ্রমেনি সিনড্রোম বলা হয়, এতে ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে—বিশেষ করে শিশুকালে এবং পরে জীবনের কোনো সময়ে স্তন ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের ক্যান্সার জেনেটিসিস্ট প্রফেসর ক্লেয়ার টার্নবুল বিবিসিকে বলেছেন, ‘এটি একটি ভয়ঙ্কর তথ্য। এটি যেকোনো পরিবারের জন্য একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং সেই ঝুঁকির সঙ্গে সারা জীবন বাঁচা। এটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ।’
টিউমার শনাক্ত করার জন্য প্রতি বছর দেহ এবং মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান এবং পেটের আল্ট্রাসাউন্ড করতে হয়। অনেক নারী ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর জন্য স্তন অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। ইউরোপিয়ান স্পার্ম ব্যাংক জানিয়েছে, ‘দাতা নিজে বা তার পরিবারের কেউ অসুস্থ নন’ এবং এই ধরনের মিউটেশন “জেনেটিক স্ক্রিনিং-এর মাধ্যমে আগে থেকে ধরা যায় না।’
তারা জানিয়েছে যে, সমস্যা শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাতাকে “অবিলম্বে ব্লক করা হয়েছে”।। তারা আরও জানিয়েছেন, সেই সময় পর্যন্ত তাদের জানা ৬৭ শিশুর মধ্যে ২৩ জনের দেহে এই জিনগত পরিবর্তন পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১০ জন ইতোমধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনের অনুরোধ এবং ডাক্তার ও রোগীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে দাতার মাধ্যমে আরো অনেক শিশু জন্ম নিয়েছে।এই সংখ্যা অন্তত ১৯৭ জন, তবে এটি চূড়ান্ত নয়। কারণ সব দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এই শিশুদের মধ্যে কতজন বিপজ্জনক জিনগত পরিবর্তন উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে তা এখনো অজানা। ফ্রান্সের হুঁও ইউনিভার্সিটি হসপিটালের ক্যান্সার জেনেটিসিস্ট ডাক্তার এডউইজ ক্যাসপার, যিনি প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তিনি এই অনুসন্ধানে বলেছেন, “আমাদের কাছে অনেক শিশু আছে যারা ইতোমধ্যেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে।’ কিছু শিশুর দেহে ইতোমধ্যেই দুটি ভিন্ন ধরনের ক্যান্সার দেখা দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে কিছু শিশু খুব অল্প বয়সে মারা গেছে।’
সেলিন (এটি আসল নাম নয়) ফ্রান্সের এক সিঙ্গেল মা, যার শিশু ১৪ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছে ওই দাতার শুক্রাণু ব্যবহার করে, যার দেহে জিনগত পরিবর্তন আছে। তিনি বেলজিয়ামে যে ফার্টিলিটি ক্লিনিকটি ব্যবহার করেছিলেন, সেই ক্লিনিক থেকে ফোন পেয়েছেন। ফোন কলে তার কন্যাকে স্ক্রিনিং করানোর জন্য বলা হয়েছে। তিনি বলেন, দাতার প্রতি ‘মোটেই কোনো কষ্ট বা রাগ নেই’ তার। তবে বলেছেন, এটি গ্রহণযোগ্য নয় যে তাকে এমন শুক্রাণু দেওয়া হয়েছিলো যেটি “সুস্থ ছিল না, নিরাপদ ছিল না এবং ঝুঁকি বহন করছিল”। তিনি জানেন, ক্যান্সার তাদের জীবনের ওপর সারাজীবন ছায়া ফেলবে। “আমরা জানি না কখন, কোন ক্যান্সার হবে এবং কতবার ঘটবে” তিনি বলেন। “আমি বুঝতে পারি, এটি ঘটার আশঙ্কা অনেক বেশি এবং যখন ঘটবে আমরা লড়ব; যদি একাধিকবার আসে, আমরা একাধিকবার লড়ব।”

এই দাতার শুক্রাণু ১৪টি দেশে ৬৭টি ফার্টিলিটি ক্লিনিকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই শুক্রাণু যুক্তরাজ্যের কোনো ক্লিনিকে বিক্রি করা হয়নি। তবে এই তদন্তের ফলস্বরূপ, ডেনমার্কের কর্তৃপক্ষ গত সোমবার যুক্তরাজ্যের হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রিওলজি অথোরিটিকে (এইচএফইএ) জানায়, কয়েকজন ব্রিটিশ নারী ওই দাতার শুক্রাণু ব্যবহার করে ফার্টিলিটি চিকিৎসা নিতে ডেনমার্কে গিয়েছিলেন।
সেই নারীদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। এইচএফইএ’র প্রধান নির্বাহী পিটার থম্পসন বলেছেন, ‘খুব অল্পসংখ্যক’ নারী এতে সংকটে পড়েছেন এবং “তাদেরকে ওই দাতার বিষয়ে জানানো হয়েছে সেই ড্যানিশ ক্লিনিকের মাধ্যমে যেখানে তারা চিকিৎসা নিয়েছিলেন”।
আমরা জানি না কোনো ব্রিটিশ নারী অন্য দেশে চিকিৎসা নিয়েছিলেন কিনা, যেখানে ওই দাতার শুক্রাণু বিতরণ করা হয়েছিল। উদ্বিগ্ন পিতামাতারা যে ক্লিনিকে সেবা নিতে গিয়েছিলেন সেখানে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ফার্টিলিটি অথরিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিবিসি দাতার পরিচয় নম্বর প্রকাশ করছে না, কারণ তিনি সৎ মনোভাব নিয়ে দান করেছিলেন এবং এ সংক্রান্ত যুক্তরাজ্যের পরিচিত সব গ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
একজন দাতার শুক্রাণু বিশ্বব্যাপী কতবার ব্যবহার করা যেতে পারে তা নিয়ে কোনো আইন নেই। তবে, প্রত্যেক দেশ নিজস্ব সীমা নির্ধারণ করে। ইউরোপিয়ান স্পার্ম ব্যাংক স্বীকার করেছে যে কিছু দেশে এই সীমা “দুর্ভাগ্যবশত” অমান্য হয়েছে এবং তারা “ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপে” আছে বেলজিয়ামে একজন শুক্রাণুদাতার শুক্রাণু শুধুমাত্র ছয়টি পরিবারে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। তবে ৩৮ জন ভিন্ন নারী ওই দাতার ৫৩টি শিশু জন্ম দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে এই সীমা নির্ধারিত, একজন দাতার জন্য ১০টি পরিবার।









