সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে উত্তেজনা যখন চরমে, তখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বহুল আলোচিত ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ ফের আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক চুক্তি দু’দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধের মাঝেও টিকে ছিল, যা উপমহাদেশে আন্তঃসীমান্ত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার এক সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত।
বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারত অভিযোগ তুলেছে—পাকিস্তান ‘সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদে মদত দিচ্ছে’, আর সেই অভিযোগের জেরেই চুক্তি বাস্তবায়নে ভারত স্থগিতাদেশ ঘোষণা করেছে। পাকিস্তান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, নদীর পানি আটকে দেওয়া ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কী আছে সিন্ধু পানি চুক্তিতে?
সিন্ধু অববাহিকার মোট ছয়টি নদী নিয়ে এই চুক্তি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু ভারতকে, আর পশ্চিমাঞ্চলের সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদী বরাদ্দ হয়েছে পাকিস্তানের জন্য, যার মাধ্যমে পাকিস্তান তার ৮০% কৃষি ও ৩০% জলবিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করে। চুক্তি অনুসারে, ভারত পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর সীমিত ব্যবহার করতে পারে—বিশেষত সেচ, জলবিদ্যুৎ ও অন্যান্য অ-ভোগব্যবহারের ক্ষেত্রে। কিন্তু নদীর মূল প্রবাহে হস্তক্ষেপ করা নিষিদ্ধ।

ভারত কি পানি বন্ধ করতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের প্রযুক্তিগত ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে পানি আটকে দেওয়া বা অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব করে না।
দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যাম, রিভারস অ্যান্ড পিপল-এর জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠক্কর বলেন, ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো সাধারণত ‘রান-অব-দ্য-রিভার’ পদ্ধতির, যেখানে বিশাল জলাধারের প্রয়োজন হয় না। ফলে অনেক পানি আটকে রাখাও সম্ভব নয়।
ভারত নিজেই চুক্তি অনুসারে বরাদ্দ পাওয়া ২০ শতাংশ পানির পুরো ব্যবহারে সক্ষম নয়, যার পেছনে একটি বড় কারণ পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব।
তাহলে ভারত কী করতে পারে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত বর্তমানে নতুন জলাধার নির্মাণ কিংবা বিদ্যমান প্রকল্পে পরিবর্তন আনতে পারে, যেগুলোর জন্য পাকিস্তানের পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই। তবে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে কঠিন ভূখণ্ড, অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ, এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়ের বাধা।
বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, ভারত যদি অবকাঠামোর মাধ্যমে সীমিত হারে পানি আটকে রাখতে পারে, তাহলে শুকনো মৌসুমে পাকিস্তান তীব্র পানি সংকটে পড়তে পারে।
টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান এফ খান বলেন, শুকনো মৌসুমে পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব অনেক বেশি। তখনই চুক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়ে উঠতে পারে।

তথ্য ভাগাভাগি বন্ধের হুমকি
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে বন্যার পূর্বাভাস ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি করতে হয়। ভারত যদি এটি বন্ধ করে দেয়, তাহলে পাকিস্তানের জলনির্ভর পরিকল্পনা হুমকির মুখে পড়বে।
ভারতের প্রাক্তন আইডব্লিউটি কমিশনার প্রদীপ কুমার সাক্সেনা বলেন, ভারত এখন পাকিস্তানের সঙ্গে বন্যার তথ্য ভাগাভাগি বন্ধ করতে পারে।
তবে পাকিস্তান দাবি করছে—ভারত আগেই মাত্র ৪০ শতাংশ তথ্য ভাগাভাগি করছিল।
পানিকে কি অস্ত্র বানানো সম্ভব?
ওয়াটার বোম্ব ধারণা অনুসারে, উজানের দেশ (ভারত) যদি হঠাৎ করে পানি আটকে রেখে পরে ছেড়ে দেয়, তাহলে তা ভাটির দেশ (পাকিস্তান)-এ ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের বাঁধগুলো সীমান্ত থেকে অনেক দূরে থাকায় ভারত নিজেই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে, ভারত এখন পলি অপসারণ বা জলাধার থেকে আকস্মিক পানি ছেড়ে দিতে পারে, যার ফলে ভাটিতে ক্ষতি হতে পারে।
কৌশলগত চিত্রে আছে চীনও
সিন্ধু নদীর উৎস তিব্বতে, আর ভারত নিজেও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের ভাটিতে অবস্থান করছে। অতীতে ভারত হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর চীন ইয়ারলুং সাংপোর (ব্রহ্মপুত্রের উৎস) একটি শাখা নদী বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন চীন ওই এলাকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভারতের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের কাছে এখনও পুরোপুরি নদীর পানি প্রবাহ থামানোর সক্ষমতা নেই। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্য বিনিময় স্থগিত এবং কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। একে সরাসরি “পানি যুদ্ধ” না বললেও, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পানি এখন আর নিছক প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং এক কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আসন্ন কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর।









