এলাকাটি সাতক্ষীরার আশাশুনিতে, তার খুব কাছাকাছি শ্যামনগর উপজেলার সীমানা। কথা হচ্ছিল এলাকার লোকজনের সাথে। মূলত কৃষি এবং পানির সমস্যা নিয়েই জানতে চাচ্ছিলাম, বুঝতে চাচ্ছিলাম অনেকটাই নিজের মত করে। পাশে একটা মন্দির ছিল, এলাকাটি অনেকটা নিশ্চুপ, সুন্দর বড় কিছু সবুজ গাছ রয়েছে, চমৎকার বিকেল হঠাৎ করে মনে হচ্ছিল হালকা বাতাস পুরোটাই গিলে খাই। বাতাসও যে মনের ঘুড়ি উড়িয়ে দিতে পারে এটা জানা ছিল না।
প্রশান্তি, ক্লান্তি এর মধ্যেই সবুজ ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে পাকা রাস্তাটি ধরে সাইকেল চালিয়ে আসছিলেন একজন ভদ্রলোক। খুব ইচ্ছে হলো তার সাথে কথা বলার, নাম পরিচয় জানার পর অনুমতি নিয়েই তার প্রিয় সাইকেলটির একটি ছবি তুললাম। গল্প তখন থেকেই শুরু, দাদা বললেন তার বিয়েতে যৌতুক হিসেবে কোন কিছু নেননি। মেয়ের বড় ভাই শখ করে একটি সাইকেল দিয়েছিলেন। প্রায় ১০ বছর হতে চলল তিনি তার প্রিয় সাইকেলটি করে প্রতিদিন আশাশুনিতে আসেন কাজ শেষে আবার শ্যামনগরে তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। তিনি প্রচণ্ড যত্ন করেন এই সাইকেলটির। উনি বলছেন, সাইকেলটি দেখতে যত পুরনো লাগছে ততটা লাগবার কথা নয়। তিনি হঠাৎ করে বললেন এখানে বাতাসে অনেক লবণ। লবণ কেড়ে নিয়েছে সাইকেলের সৌন্দর্য ঠিক তেমনি আমাদেরও। ব্যাপারটা কি অদ্ভুত বাতাসেও লবণ!
বাংলাদেশের উপকূল সম্পর্কে আমাদের যাদের কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, আমরা জানি কি প্রতিকূলতার মধ্যে সে অঞ্চলের মানুষগুলো বেঁচে আছে, মাটিতে লবণ, পানিতে লবণ, এমনকি বাতাসেও। দাদা আরো বলতে থাকলেন, ফোনে, টিভিতে কত সুন্দর সুন্দর গরু দেখা যায়। আর আমাদের গরুগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন তো ওরা কিন্তু ডায়েট করে না। আমাদেরও ইচ্ছা করে ওদের শরীর স্বাস্থ্য ভালো করতে, মোটা করতে অনেকটা আপনার মতো। কিভাবে করব, এখানের মাটিতে প্রাণের বড়ই অভাব, কারণ নোনা জল সবকিছুকেই খেয়ে ফেলে, যেমন আমার সাইকেলটিকে খেয়ে ফেলছে। আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি ওর প্রতি আমার প্রচণ্ড ভালবাসা, আমি হারবোনা এই সাইকেলটি নিয়েই বেঁচে থাকব এই নোনা জল আর নোনা মাটির সাথে। বুকের ভিতরে কোথায় যেন প্রচণ্ড রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। কি প্রচণ্ড আবেগ আর মায়া দেখে। আচ্ছা বলুন তো উনার দোষ কি?
এই যে দিন দিন নোনা জল মাটি নোনা হয়ে যাওয়া এর জন্য কি উনি দায়ী? উনি হয়তো জানেনও না পৃথিবীর অন্য কোন জায়গায় আমাদের মতো কিছু মানুষের কাজের জন্য হয়তো এই পরিস্থিতি।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব নিয়ে পৃথিবীর সকল দেশ বছরে একটা সময় কোনো না কোনো জায়গায় মিলিত হয়। যাকে আমরা কনফারেন্স অফ পার্টিজ, সংক্ষেপে কপ বলি। আমি সব সময় মিলনমেলাকে সাধুবাদ জানাই। কারণ তার মাধ্যমেও তো অনেক মানুষ জানতে পারছে কোথায় কি হচ্ছে। আর তা না হলে নতুন তথ্য জানার পথটাও হয়তো বন্ধ হয়ে যেত।
আমাজন অরণ্যের তীরে ব্রাজিলের বেলেম শহরে ১০-২১ নভেম্বর বসেছে জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-৩০)। যেখানে প্রায় ১৫০ দেশের প্রতিনিধি জলবায়ু সংকট মোকাবিলার পথ নির্ধারণে একত্রিত হয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করে আসছে জাতিসংঘ। যেখানে জাতিসংঘের কনভেনশনের সদস্যরা জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে মানবজাতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকরী বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য বিশ্বনেতা ও তাদের প্রতিনিধিরা এ পর্যন্ত ৩০ বার আলাপ-আলোচনা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পুরো পৃথিবী আজ যে রকম জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকির মুখে রয়েছে, সেদিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সম্মেলনগুলো ব্যর্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে, আমাদের পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, হিমালয়ের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ ও সংখ্যা আরও বেড়েছে। বলা যায়, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জরুরি অবস্থা চলছে।
জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে প্রচুর প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এগুলো কার্যকর করার জন্য উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। বেশিরভাগ সম্মেলনেই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উন্নত ও ধনী দেশগুলো জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত গরিব দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাদের দায় সারতে চান।
আপেক্ষের বিষয় হচ্ছে, জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি জলবায়ু যুদ্ধ মোকাবিলায় ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির তুলনায় যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন দশকের পুরোনো এই সম্মেলন এখন অনেকটাই রাজনৈতিক হওয়ায় কার্যকর ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাবের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালটি বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে। এছাড়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া জলবায়ু কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সেই সাথে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক অর্থায়ন ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সার্বিক কল্যাণে জলবায়ু অর্থায়নের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, এখন প্রতিটি মানুষের উচিত জলবায়ু যোদ্ধা হিসেবে সক্রিয় ও নিবেদিতভাবে কাজ করা। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যেক দেশকে তার অভিযোজন, প্রশমন এবং দুর্যোগ পরবতী ক্ষয়-ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে হবে। এছাড়া বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের প্রতিশ্রুতিগুলোকে কার্যকর এবং টেকসই কর্মে রূপান্তর করার ওপর জোর দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা সম্ভব হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









