শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিশ্চিত করা এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সরকারি–বেসরকারিভাবে সমন্বিত টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিশু-বান্ধব সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে “জাতি গঠনে শিশু-বান্ধব সাংবাদিকতা” বিষয়ে জাতীয় পরামর্শসভা থেকে এই আহ্বান জানানো হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সিনারগোজ এর সহযোগিতায় গণমাধ্যম বিষয়ক উন্নয়ন সংগঠন সমষ্টি এ সভা আয়োজন করে।
বাংলাদেশ সরকারের আইসিবিসি সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্পের নানা দিক এতে তুলে ধরেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় জানানো হয়, ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে ৫১ জনের বেশি মানুষ, যার ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়, যা ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আইসিবিসি প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটি ভিত্তিক শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপন, ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ সহায়তা এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জীবনরক্ষাকারী সাঁতার ও নিরাপত্তা কৌশল প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ২০২২ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি সফলভাবে ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, ‘‘বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে কাজ চলছে। এ পর্যায়ে আরও ১৪ জেলায় ৫ লাখ ২০ হাজার শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং ৩ লাখ ২০ হাজার শিশুকে প্রারম্ভিক বিকাশ সহায়তা দেওয়া হবে।”
‘আস্থায় হাত ধরি, শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে মূল আলোচনায় পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধসহ শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও স্থায়ীত্বশীল উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের মাঝে আস্থার সম্পর্ক জোরদার করার তাগিদ দেন বক্তারা।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক মোসা. আরজু আরা বেগম-এর সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ এনডিসি।
অতিথি হিসেবে ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শবনম মুস্তারী এবং আইএমইডি’র মহাপরিচালক ডক্টর আলম আমিন সরকার।
স্বাগত বক্তৃতা করেন যুগ্ম সচিব এবং আইসিবিসি প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল কাদির।
‘‘আস্থায় হাত ধরি, শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ি’’ বিষয়ে মূল আলোচনার সূত্রপাত করেন সিনারগোস বাংলাদেশ এর কান্ট্রি হেড এশা হুসেইন। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন চ্যানেল আই-এর চীফ নিউজ এডিটর ও সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান।
সভায় সিনিয়র সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন: চর্চা ডটকম সম্পাদক সোহরাব হাসান, চ্যানেল আই-এর প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমদ, চ্যানেল ২৪ এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম, দৈনিক যুগান্তরের উপ-সম্পাদক শুচী সৈয়দ, দৈনিক প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী, বাংলাভিশন এর সিনিয়র নিউজ এডিটর সালমা ইয়াসমিন, দৈনিক মানবজমিন-এর বার্তা সম্পাদক কাজল ঘোষ, দৈনিক ইত্তেফাক-এর মহিলা অঙ্গন সম্পাদক রাবেয়া বেবী, একাত্তর টেলিভিশন এর বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমীন, দৈনিক আমার দেশ-এর সিনিয়র রিপোর্টার সাইদুর রহমান রুমী এবং অন্যরা।
সিভিল সোসাইটির পক্ষে আলোচনা করেন বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বেন) এর ভাইস চেয়ার মাহমুদা আখতার, সিনারগোস বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ রিজওয়ান খান পিএমপি, সিআইপিআরপি’র গবেষক ডা. আল আমিন প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ এনডিসি বলেন, শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ নিশ্চিত করা এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের জন্য সরকারের উদ্যোগগুলো সম্প্রসারণের কাজ চলছে; এ বিষয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন।
অতিরিক্ত সচিব শবনম মোস্তারী বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা কার্যক্রমের সফলতা ও চ্যালেঞ্জের দিকগুলো গণমাধ্যমে আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা প্রয়োজন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মহাপরিচালক ড. মো. আল আমিন সরকার বলেন, শিশুদের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর প্রভাব মূল্যায়ন করে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও পুরনোগুলোর সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
স্বাগত বক্তৃতায় প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, “আইসিবিসি প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুর সুরক্ষা ও প্রারম্ভিক বিকাশে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। অভিভাবকদের মাঝে শিশু বিকাশসংক্রান্ত সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সঠিক প্যারেন্টিং চর্চা এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
সিনারগোস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এশা হুসেইন বলেন, এই প্রকল্পের অন্যতম শক্তি স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। শিশুযত্ন কেন্দ্রের জন্য আলাদা অবকাঠামো কেনা বা ভাড়া নেওয়া হয় না—স্থানীয়রাই তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করেন।”
তিনি জানান, নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের নিয়েই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।
চর্চা ডট কম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয়।’
চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান বলেন, অতীতের মত শিশু সংগঠনগুলো বর্তমানে কার্যকর নেই। গণমাধ্যমগুলোও শিশুদের নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করছে না। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকানি পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
সিনিয়র সাংবাদিকরা জোর দিয়ে বলেন, “পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু যেহেতু প্রতিরোধযোগ্য এ বিষয়ে সংবেদনশীল, তথ্যভিত্তিক ও সমাধানমুখী সাংবাদিকতা অনেক ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে।’’ নগরে বাস করা শিশুদের বিকাশ ও সুরক্ষার জন্যও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বিশেষজ্ঞ আলোচক মাহমুদা আখতার বলেন, “শিশুদের জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলোর মাল্টিসেক্টরাল সমন্বয় চ্যালেঞ্জিং হলেও গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে এই উদ্যোগগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।”
সভাপতির বক্তৃতায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক যুগ্ম সচিব মোসা. আরজু আরা বেগম উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের জন্য দেওয়া উদ্যোগগুলোর পাশে থাকার আহ্বান জানান ।
জাতি গঠনে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন, বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি বলেও মন্তব্য করে এ বিষয়ে পারসস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।









