বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহকারীদের বকেয়া পড়ে আছে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ৫৫৮ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। বৈদেশিক মূদ্রার তারল্য (ডলার) সঙ্কটের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। যদিও বিপিসির কাছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ বিভিন্ন তফশিলি ব্যাংকে জমা রয়েছে।
বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় আসছে সেপ্টেম্বর থেকে নির্ধারিত তারিখে তেল আমদানি করা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমদানিতে সংকট দেখা দিলে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় পড়বে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার- ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। যার প্রভাব পড়তে পারে সারা দেশে।
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৯২ শতাংশ আমদানি করা হয়। নিয়মিত খুচরা মূল্য সমন্বয় করায় বর্তমানে প্রতি মাসে তেল বিক্রি থেকে যে পরিমাণ টাকা আয় হয় তা দিয়েই আমদানি বিল পরিশোধ করা সম্ভব। বরং বিক্রীত অর্থ থেকে কিছু লাভও হয় বিপিসি এবং বিপণনকারী কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের।
সমস্যাটা হচ্ছে টাকায় বিক্রি করলেও আমদানি হয় মার্কিন ডলারে। কিন্তু দেশে ডলার সঙ্কট থাকায় নির্ধারিত পরিমাণ বিল পরিশোধ করতে পারছে না বিপিসি। এই অর্থের সংস্থানও করতে পারছেনা সংস্থাটি। এমন পরিস্থিতিতে বকেয়া বিল পরিশোধ না করলে বাংলাদেশের কাছে তেল বিক্রি করবে না বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি।
বিপিসি’র তথ্য বলছে: বিদেশি ছয় প্রতিষ্ঠান থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভিটল এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে। বিপিসির (১৪ আগস্ট পর্যন্ত) কাছে প্রতিষ্ঠানটির পাওনা ২০২ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাওনা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইটিএফসি) কাছে। তাদের পাওনা ১০৩ মিলিয়ন ডলার।
এছাড়া, ইউনিপেক সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে বিপিসির কাছে পায় ৫৯ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়ার পিটি ভূমি ছিয়াক পোছাকো (বিএসপি) প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ডলার, ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল) প্রায় ৩৪ মিলিয়ন ডলার, পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড (পিটিএলসিএল) পাবে প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলার।
আসছে সেপ্টেম্বর মাসে ২ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল, ৬৫ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে বিপিসির। কিন্তু বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় এখন পর্যন্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরবরাহ নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
সবশেষ হালনাগাদকৃত তথ্য বলছে: দেশে মজুত ছিল (৭ আগস্ট) ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন ডিজেল, ৫৬ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল, ৩৭ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন অকটেন, ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৫৮ হাজার ৭৭৭ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল। ১৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ তেলের মজুদ ছিলো তা দিয়ে ৩৩ দিনের ডিজেল, ১৫ দিনের অকটেন ও ১৪ দিনের পেট্রোলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। যদিও জ্বালানী তেলের নীতি বলছে দেশে ৬০ দিনের প্রযোজনীয় জ্বালানি তেলের মজুদ থাকার কথা। তবে সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের তেলের মজুদ রাখা হতো। এমন পরিস্থিতিতে জরুরী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে জ্বালানি তেলের সঙ্কট দেখা দিতে পারে বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।









