জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার চিন্তা থেকে নৌকাস্কুল উদ্ভাবন করে দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলা বাংলাদেশি স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান তার এই উদ্ভাবনের জন্য ২৭তম ‘গ্লোবাল লাভ অফ লাইভস অ্যাওয়ার্ডস’ বা ‘নোবেল লাইফ প্রাইজ’ অর্জন করেছেন।
রিপাবলিক অফ চায়না (তাইওয়ান) এর প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তা তার কার্যালয়ে রেজোয়ান ও অন্যান্য পুরস্কার বিজয়ীদের সম্মানিত করে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, স্থপতি হিসেবে রেজোয়ান জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি সমাধান তৈরি করেছেন, যা বিশ্বকে উপকৃত করছে। তার ভাসমান স্কুল শিশুদের জন্য আশা সঞ্চার এবং শিক্ষা লাভের সুযোগ নিশ্চিত করেছে।” প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসাবে রেজোয়ানও প্রেসিডেন্ট সহ অন্যান্য সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সিটিকে ফাউন্ডেশনের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক এবং পুরস্কার বিজয়ীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান করেন।
স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মতো তাইওয়ানের জনগণও রেসিলিয়েন্ট, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে তারা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্নির্মাণ করেছে। তাই আমাদের নৌকা স্কুলের জন্য তাইওয়ান থেকে এই স্বীকৃতি পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। তারা আমাদেরকে ফরমোসা (সুন্দর দ্বীপ) এর নদীতে একটি নৌকা স্কুল তৈরি করতে বলেছে। আমরা বাংলাদেশিরা এভাবে আরও অনেক জীবন বদলে দেওয়া সৃজন-উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নানান সংকটের সমাধান বের করতে সক্ষম হবো, এটাই আমি আশা করি।

এই বছরের ‘নোবেল লাইফ প্রাইজ’ বিজয়ীদের মধ্যে আছেন সুউ-চেন চিয়াং, এশিয়ার প্রথম নারী পর্বতারোহী যিনি বিশ্বের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ (সেভেন সামিট) আরোহণ করেছেন; রাইয়ান আলশেবল, একজন সিরিয়ান শরণার্থী যিনি জার্মানির একটি শহরের মেয়র হয়েছেন; এবং জে-জিং গং, একজন তরুণ উদ্যোক্তা যিনি প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার প্রচলন করে তাইওয়ানের গ্রামীণ কৃষিতে বিপ্লব এনেছেন। এক সপ্তাহব্যাপী পুরস্কার সংক্রান্ত জনকল্যাণ কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে বিজয়ীরা তাইপে, ইলান, চায়াই, তাইনান এবং কাওশাং শহরের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং সংবাদপত্র পরিদর্শন করে তাদের জীবনের গল্প বলেন।
১৬ সদস্যের জুরি সারা বিশ্ব থেকে মনোনীত ৩ হাজার ৪৯৯ প্রার্থীর মধ্য থেকে রেজোয়ানকে নির্বাচিত করেন। তাকে নৌকা স্কুল উদ্ভাবনের জন্য এবং বিশ্বব্যাপী ভাসমান শিক্ষা আন্দোলন শুরু করার জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সিটিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চো চিন-হুয়া বলেন, রেজোয়ানের উদ্ভাবন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার একটি কার্যকর পদ্ধতি এবং প্রকৃত অর্থেই তিনি ‘বাংলাদেশের আর্থ হিরো’। আমাদের পুরস্কার গত দুই দশক ব্যাপী পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও জলবায়ু অভিযোজনে তার অবদানের স্বীকৃতি দেয়।

বাংলাদেশের বন্যাপীড়িত অঞ্চলের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু, যাদের বছরের দীর্ঘ একটা সময় স্কুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না, তাদেরকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার স্বপ্ন সর্বদা ধারণ করতেন নাটোরের সন্তান মোহাম্মদ রেজোয়ান। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ – এই তিন জেলার ১০টি উপজেলা-বিস্তৃত বিশাল জলাভূমি চলনবিলপারের গ্রামের বাড়িতে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। পানিবেষ্টিত মানুষের সমস্যা-জর্জরিত জীবন খুব কাছে থেকে দেখে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেছেন সেই স্কুলজীবনেই। সেটাই পরিপক্ক হয় সিধুলাই স্ব-নির্ভর সংস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর ২০০২ সালে রেজোয়ান চলনবিলের অথৈ পানিতে ভাসান তাঁর অনবদ্য উদ্ভাবন ‘নৌকাস্কুল’। রেজোয়ানের এই অনন্য উদ্ভাবনটি আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আরো ৮টি দেশে।

বাংলাদেশি স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ানের নৌকাস্কুল ধারণাটি ‘উদ্ভাবন’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনিসেফ, ইউএনইপি ও ইউএনডিপির মতো জাতিসংঘের বিভিন্ন তহবিল ও কর্মসূচির কাছ থেকে। এছাড়াও ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘আর্থ হিরোস’ নামের প্রখ্যাত ব্রিটিশ গ্রন্থে বিশ্বের ২০ জন ‘আর্থ হিরো’র তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়েছে রেজোয়ানের নাম। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, তাইওয়ানসহ বিশ্বের নানান দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে রেজোয়ান ও তাঁর ভাসমান স্কুল বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পুরস্কারটি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বব্যাপী প্রদান করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ভাবনী নৌকা স্কুলের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা সুবিধা প্রদান করার জন্য রেজোয়ানকে ‘মেডেল অফ এচিভমেন্টস’ বিভাগে সম্মানিত করা হয়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকে তাইওয়ানের চো তা-কুয়ান কালচারাল এন্ড এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন এই পুরস্কারটি প্রদান করছে, যা ‘নোবেল লাইফ প্রাইজ’ নামেও পরিচিত।









