পারিবারিকভাবে ১৪ বছর আগে বিয়ে হয় মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির মেয়ে মাহমুদা হক বৃষ্টি ও রাজধানী বাড্ডার এস এম সেলিমের মধ্যে। স্বজনরা বলছেন বৃষ্টি ও সেলিমের সংসার ভালোই চলছিল। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত সেলিম। কিন্তু করোনাকালে চাকরি হারার পর থেকেই শুরু পারিবারিক কলহের। বাসা ভাড়ার টাকা তুলে উধাও হয়ে যেতো সেলিম। একটা পর্যায়ে স্পষ্ট হয়, একাধিক নারীর সঙ্গে পরকীয়া ও অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত সেলিম।
সর্বশেষ দুই বছরে অন্তত তিনবার পারিবারিক বৈঠক হয়েছিল বিবাহ বিচ্ছেদের। তবে স্ত্রী মাহমুদার বাধায় পারিবারিক ওই চেষ্টাগুলো পূর্ণতা পায়নি। মাহমুদা বলেছিলেন ‘আর কটা মাস দেখি, যদি বদলায় সেলিম’। তবে বদলায়নি সেলিম। বরং পৃথিবী থেকে মাহমুদাকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন সেলিম।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সেলিম হত্যাকাণ্ডে নিজের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেন। পারিবাহিক কলহ, আর নিজের পরকীয়া সম্পর্কের জেরে স্ত্রীকে সারা জীবনের জন্য সরিয়ে দিতে পরিকল্পনা করেন সেলিম। সে অনুযায়ী ৩০টি ঘুমের ওষুধ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে স্ত্রীকে খাওয়ান। তবে মেয়েকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল না তার। কিন্তু মাহমুদার সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো দুধ খেয়ে ফেলে নয় বছরের সানজাও। অবশেষে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় মারা যায় মা-মেয়ে।
মাত্র নয় বছরের সানজা মারওয়া নামের মেয়েটি এখন অতীত। ৯ মাসের ছেলে সন্তান সারিম জানে না মা ও বড় বোনকে নিজের বাবা সুপরিকল্পিতভাবে দুধের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খুন করেছে।
মেয়ে ও নাতনীর মৃত্যুতে হতবিহ্বল বাবা মো. মোজাম্মেল হক বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় বুধবার রাতে আটক সেলিমকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
বাবা মো. মোজাম্মেল হক বলেন: মঙ্গলবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সেলিম আমার দ্বিতীয় কন্যা মিম আক্তারকে মোবাইল করে জানায়, মাহামুদা হক বৃষ্টি ও নাতনী সানজা কোনো সাড়া শব্দ করছে না এবং তাদের শরীর শিথীল হয়ে গেছে। ঢাকায় থাকা নিকট আত্মীয়রা বাড্ডা ওই বাসায় গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রুমে বৃষ্টি ও সানজার নিথর দেহ দেখতে পায়। সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঢাকায় আসি এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে আমার মেয়ে মাহামুদা ও নাতনী সানজার মৃতদেহ দেখতে পাই।
বাড্ডা থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর মেরুল বাড্ডা এলাকার একটি বাসা থেকে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মাহমুদা হক বৃষ্টি (৩৩) ও নয় বছরের সানজা মারওয়া নামে মেয়েকে অবচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ফরায়েজী হাসপাতালে নিয়ে যায় পরিবার। খবর পেয়ে পুলিশ ফরায়েজী হাসপাতালে রাত আনুমানিক তিনটার দিকে পুলিশ যায়। ফরায়েজী হাসপাতাল উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন। বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ঢামেকের জরুরী বিভাগের কতর্ব্যরত চিকিৎসক মা ও মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় স্বামী সেলিমকে আটক করা হয়।
মা-মেয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রথমে আটক সেলিম দাবি করলেও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকদের বরাতে পুলিশ জানতে পারে বিষপানের কোনো আলামত মেলেনি। শ্বাসরোধেও হত্যা নয়, মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ঔষধের আলামত মিলেছে। পুলিশের বিশদ জিজ্ঞাসাবাদে সেলিম স্বীকার করেন দুধের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো হয়েছিল মা-মেয়েকে।
মাহমুদার মামা রাসেল শিকদার জানান, বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য পরিবারের চাপেও রাজি হয়নি মাহমুদা। তার বক্তব্য ছিল- আর কটা মাস দেখি। যদি বদলায় সেলিম। কিন্তু সেলিম বদলায়নি। সম্পর্কও বিচ্ছেদ করেনি। বরং সারা জীবনের জন্য আমাদের মেয়েটা ও নাতনীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলো। সেলিম প্রায় বৃষ্টিকে মারধর করতো। গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করেছে। খারাপ লাগছে, মেয়েটা দুই সন্তানের মুখ চেয়ে সংসারটা টেনে গেছে। খারাপ লাগছে নয় মাসের নাতি শিশু সারিমের জন্য। এমন বয়সে মা ও বোনকে হারাতে হলো।
বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার একমাত্র আসামি এস এম সেলিম। মৃত্যুর সঠিক কারণ উঠে আসবে ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে। এই ঘটনায় আরও কারো ইন্ধন ছিল কিনা তা আমরা খতিয়ে দেখছি। বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে আর কার কার সঙ্গে মিশতো সেলিম, তাদের কারো যোগসাজশ ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহীদুল্লাহ বলেন, অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় প্রায় সময় স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হতো। আটক সেলিম পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, পরিকল্পনা করেই গত রাতে বাইরে থেকে দুধ কিনে আনা হয়। সেই দুধে কেনা ত্রিশটি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। তাতে স্ত্রী বৃষ্টি ও তার শিশু কন্যার মৃত্যু হয়।







