ডাকনাম চাটনী। দাদা খুব ভোজন রসিক ছিলেন তাই আদরের বড় নাতনির নাম রেখেছিলেন চাটনী। শুধু তাই নয়, সব নাতি পুতিদের নাম এমনই ছিল জেলী, ফিরনি, লুচি, মোহন এমন আর কি!
শিক্ষা আভিজাত্য সবকিছুর মিশেলে বেড়ে ওঠা বাংলা সিনেমার তিন কিংবদন্তি সুচন্দা, ববিতা ও চম্পার। তাদের তিন ভাই। বড়জন বুয়েটে পড়া, অস্ট্রেলিয়া স্যাটেলড। পরেরজন পাইলট, আমেরিকায় সেটেলড এবং সব শেষ তিনিও আমেরিকায় পরিবারসহ।
বাবা তৎকালীন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করা এবং সরকারি চাকরিজীবী। মা পড়েছিলেন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে, ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার এবং ডাক্তারি পরীক্ষায় অল পাকিস্থানে মেয়েদের মধ্যে প্রথম। মা ১৯৪৩ সালে মেট্রিক পাস করেন। সাতজনের মাঝে দুইজন ছিলেন মুসলিম মহিলা। আরেকজন সুচন্দার ফুপু। মায়ের হার্টের সমস্যা থাকায় ৪০ বছর বয়সে মারা যান। সে সময় কলকাতায় পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে মা মাসে ১০০ টাকা পেতেন।
দাদা-দাদী সবাই সে সময় শিক্ষা দীক্ষা সবকিছুতে এগিয়েছিলেন। দাদা ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী থাকায় দাদার নাম ছিল ‘দলিল দাদা’। ভীষণ সময়ানুবর্তী ছিলেন।
দাদি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন, গোল্ড মেডেল পাওয়া। দাদি নিয়মিত চিঠি লিখতেন পরিবারের সবাইকে। দাদির ছিল নজরকারা সীতাহার, যা নিয়ে নাতিপুতিদের খুব মজার গল্প আছে। যেমন: দাদি বলেছিলেন এই সীতাহার নাতনিদের দিলে তা পরের সংসারে চলে যাবে। তখন সুচন্দা অবুঝ মনে দাদিকে বলেছিলেন, দাদী আমি যদি কোনদিন বিয়ে না করি তবে কি তুমি আমায় দেবে এই সীতাহারটি!
দাদির বিয়ের শাড়িতেও সোনার কারুকাজ করা ছিল এমনই স্মৃতিচারণ করেছেন লেখিকা। দাদাকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন, নাতি পুতিদের জন্য দুধের সর তুলে রাখা, বিভিন্ন কায়দায় খাবার সংরক্ষণ, আচার বানানো সব-ই উঠে এসেছে স্মৃতিকথায়। দাদি পরিবারের সবাইকে আগলে রাখা, দাদির বাপের বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট এগুলোর গল্প তিনি লিখেছেন। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল রূপকথার কোন জগতে হারিয়ে যাচ্ছি। লেখনী ঝরঝরে। লেখাটি আরো ভালো লাগবে হয়তো কোন কোন অংশ অনেকের ছোটবেলার সাথে কিছুটা মিলবে। সেই সাথে নিজের মনের ভিতর নিজের ছোটবেলাটাও অগোচরে ভেসে উঠবে।
ফুপু চাচারা সবাই শিক্ষিত এবং সম্পদশালী। ফুপারা কেউ সিনেমা হলের মালিক, কেউ আনসারের ডিরেক্টর (মেয়ের বড় ভাইকে দেখে মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি) এমনটি ছিলেন।
নানির বাড়ির অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন। মামা বাড়িতে পিকনিক, বিলে মাছ ধরা, ইছামতি বিল, মানুষের পায়ের গর্তে উঠানে আটকে থাকা মাছ ধরা, তেতুলে ঠোসায় ভাত রান্না, হিজল গাছের বর্ণনা, নানীর ভালোবাসা, রাতে আম কুড়ানো আরো অনেক কিছু। মায়ের বাধ্য থাকার কথাটিও বারবার বলেছেন। দুধের সর চুরি করে খাওয়া, ঘি চুরি করে খাওয়া এরকম ভাই-বোনদের সাথে অনেক খুনসুটির গল্প আছে। তালের ডোঙ্গার কথা বলেছেন তিনি। যার ব্যবহার করেছেন হাজার বছর ধরে ছবিতেও।
বড় বড় চিতল মাছের কাঁটা দিয়ে উল বোনা শেখা, ধানের গোলা, ইন্দারা সবকিছুর বর্ণনা আছে, আছে স্কুল জীবনের সংস্কৃতি চর্চার গল্প। ববিতার কথা বলেছেন ইনস্ট্যান্ট বুদ্ধিমতী (বাবার জন্য হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা), আর চম্পাকে বলেছেন ম্যানেজ মাস্টার। ফাইনাল পরীক্ষার আগে বাদাম খাওয়ার জন্য বোন ববিতা ও ভাই চার্চিল এর নোট খাতা বিক্রির গল্প আছে। বিয়ের পরে ববিতার বাড়িতে রান্নার মজার গল্পসহ ভাইবোনদের নিয়ে অনেক গল্প আজ স্মৃতিচারণ আছে পুরো বইজুড়ে। সাথে আছে সন্তান নাতিপুতিদের ভালোবাসার গল্প। ১৯৮৮ সালের বন্যার গল্পও আছে। সব মিলিয়ে বইটি হয়েছে কালের সাক্ষী।
স্কুল জীবনে সিনেমা দেখতে বাবার অনেক অনুমতির দরকার ছিল। তাকিয়ে দেখেছেন সিনেমার পোস্টার, পরবর্তীতে সেখানে তার পোস্টার শোভা পেত। যশোরের তসবির মহলে সিনেমা মুক্তির গল্পসহ যশোরের সার্কিট হাউজের বটগাছ, ভোলার তোলা, তাজ হোটেলের চানাচুর, পটলা ময়রার মিষ্টি, যশোরের বিখ্যাত চিরুনি, সাগরদাড়ির মেলা এসবের অনেক স্মৃতিচারণ আছে।
স্কুল জীবনের শিক্ষকদের স্মৃতিচারণ আছে। ডক্টর কুদরত-ই-খুদার কাছে পড়াশোনার সুযোগ হয়েছে, কারণ তার স্ত্রী ছিলেন সুচন্দার মায়ের খুব ঘনিষ্ট। স্কুলের পুণর্মিলনীতে অংশ নেওয়া বান্ধবীদের সাথে সাক্ষাৎ সব কিছুরই স্মৃতিচারণ করেছেন লেখিকা।
প্রথম সিনেমা রোমেনা আফাজের গল্প অবলম্বনে কাগজের নৌকা। বেহুলা সিনেমার শুটিংয়ের বর্ণনা দিয়েছেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। বিশেষ করে, বেহুলা যখন মৃত লক্ষিন্দরকে নিয়ে কলা গাছের ভেলায় দিনের পর দিন ভেসে বেড়ানোর চিত্রায়ন যেভাবে ধারণ করা হয়েছে সেই গল্প পড়ে, আমি ইউটিউবে গিয়ে সিনেমার ঐ দৃশ্য বারবার দেখেছি। এটাই লেখনির সার্থকতা। জহির রায়হানের সাথে প্রেম বিয়ে, সংসারের গল্প মুক্তিযুদ্ধে কলকাতায় পাড়ি জমানো, সিনেমা বানানো পরবর্তী সময়ে জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া এবং নতুন করে আবার জীবনকে গুছিয়ে নিতে যে সংগ্রাম তার প্রতিটি ধাপের বর্ণনা আছে সুচন্দার আত্মজীবনীতে। জীবন থেকে নেয়া সিনেমা কলকাতায় প্রদর্শিত হয়ে যে অর্থ পেয়েছিলেন জহির রায়হান তা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে দান করেন।
‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ছবি তৈরি এবং অসম্পূর্ণ কাজটি এগিয়ে না নিতে পারার দুঃখ করেছেন লেখিকা। জহির রায়হান ভালো হাত দেখতে পারতেন, সুচন্দাকে নিয়ে যা বলেছিলেন পরবর্তীতে তার অনেক কিছুই মিলে গেছে। জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতার নানা বর্ণনা নানা আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন তার সহধর্মিনী সুচন্দা।
জীবন থেকে নেয়া সিনেমায় রওশন জামিলের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা এবং গওহর জামিলকে সিনেমার শুটিংয়ে দেয়া মজার নির্দেশনার গল্প আছে। জীবন থেকে নেয়া সিনেমায় ব্যবহার করা চাবির গোছা এবং পরবর্তীতে তা হারিয়ে ফেলার গল্প বলেছেন। যেখানে বলেছেন, আমার সংসারটিও আর নেই চাবির গোছাও আজ হারিয়ে গেল (মৌচাক মার্কেটে শপিং করতে গিয়ে গাড়ির ভেতর থেকে লক ভেঙ্গে অন্যান্য জিনিসের সাথে চাবির গোছা নিয়ে যায়, যা ব্যবহার করা হয়েছিল জীবন থেকে নেয়া ছবিতে)।
সংসার জীবনের গল্পে শহীদুল্লাহ কায়সারের বিয়ের গল্প বর্ণনা করেছেন। ভালো রাধুনী সুচন্দা।
কবি সুফিয়া কামালের স্নেহ আর ভালোবাসার বর্ণনা করেছেন অনেক জায়গায়।
চলচ্চিত্র জীবনে যাদের সাথে কাজ করেছেন তাদের প্রত্যেকের বর্ণনা আলাদাভাবে করেছেন। পরিচালক, প্রযোজক, প্রদর্শক, ক্যামেরাম্যান, মেকআপ ম্যান সবারই নাম ধরে ধরে বলেছেন তিনি। তিন কন্যা সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন লেখিকা সেই সাথে হাজার বছর ধরে সিনেমা তৈরীর পেছনের গল্প আছে এই বইতে। স্বাধীনতা পরবর্তী বিদেশে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরার গৌরবের অধিকারী ছিলেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল সুচন্দার। বর্ণনা করেছেন পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় শুটিং এর অভিজ্ঞতা। সিনেমার আবহ সংগীত বুঝে গান লেখা হত তখন। সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট খুঁটিনাটি অনেক বিষয় জানা যাবে বইটি থেকে।
সুমিতা দেবীকে নিয়ে তার বইতে যেভাবে বর্ণনা দেয়া আছে তাতে তৎকালীন শিল্পীরা মানসিকভাবে যে কতখানি উদার ছিলেন তা বোঝা যায়।
পারিবারিকভাবে সুচন্দার দায়িত্বশীলতা, শরাফতগঞ্জের বাড়িটি মায়ের নামে কেনা, গাড়ি কেনা পরবর্তীতে মায়ের ও নানীর মৃত্যু শোক, পরিবারের চাওয়ায় আবারও সন্তান সংসার ইত্যাদি।
প্রাপ্তির তালিকায় আছে দর্শকদের ভালোবাসা, বরেণ্য জনদের (সত্যজিৎ রায় ও সুচিত্রা সেন) সাথে ঘনিষ্ঠতা আর দেশে-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। সর্বোপরি, পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিতে পারা









