যেকোনো বৈষম্য, দুর্নীতি, অন্যায়-অনিয়ম দেখলে সবার আগে গর্জে ওঠেন যিনি, তিনি আশফাক নিপুন। গেল ১৫ বছর ধরে বিদায়ী আওয়ামী লীগের নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে এই নির্মাতা সোচ্চার ছিলেন। তিনি তার কর্মেও প্রতিবাদের ছাপ রেখেছেন। এ কারণে বিভিন্ন সময় নিপুনকে নানা চাপ সামলাতে হয়েছে। তবে থেমে যাননি সাড়া জাগানো ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’-খ্যাত এই নির্মাতা।
দেশে সদ্য ঘটে যাওয়া বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার পতনের এক দফা দাবীতে জেগে ওঠে সারাদেশের মানুষ। এই ক্রান্তিকালে ফ্রন্ট লাইনে থাকাদের অন্যতম হলেন আশফাক নিপুন। ছাত্র-জনতার এই বিজয় এবং আশফাক নিপুনের সমর্থন ও প্রতিবাদী তৎপরতা শেষে অভিজ্ঞতা জানতে মঙ্গলবার আশফাক নিপুনের অফিসে চ্যানেল আই অনলাইনের এই প্রতিবেদক কথা বলেন দীর্ঘক্ষণ।
আশফাক বলেন, “১৫ বছরের স্বৈরশাসন থেকে দেশ মুক্ত হওয়াটা বিশাল বিজয়। এই লম্বা সময় সব সেক্টরে দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখান থেকে মুক্ত করা জন্য জনগণের যে আকাঙ্খা সেটা শুরু করেছিল ছাত্ররা। পরে এই আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এটা সবচেয়ে বড় আন্দোলন এবং বিজয় হিসেবে দেখছেন আশফাক নিপুন। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে। ছাত্র-জনতা ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে তারা কোনো ধরনের বৈষম্য চায় না। অন্তবর্তীকালীন সরকার আসার আগে কয়েকদিনের সারাদেশে অনেক স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে এটা উদ্বেগের ব্যাপার। দেশের অনেক স্থানে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হয়েছে সেটা উদ্বেগজনক। ছাত্ররা এখনও নিজেদের চেষ্টায় সবকিছু পাহারা দিচ্ছে, ট্র্যাফিক কন্ট্রোল করছে। এটাই আন্দোলনকারীদের বিউটি। তারা সরকার পতনে থেমে ফিরে যায়নি, কাজ করে যাচ্ছে। এটাই নিউ জেনারেশন।’
স্বৈরাচার পতনে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে আশফাক নিপুন বিপ্লবের প্রথম ধাপ অতিক্রম বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘বিপ্লবের একাধিক ধাপ থাকে। আমরা কেবল প্রথম ধাপ পার হয়েছি। সামনে আরও কঠিন ধাপ অতিক্রম করতে হবে। সবাইকে এক থেকে ধীরে ধীরে সেগুলো পার হতে পারে। তবেই আমরা গণতান্ত্রিক, সাম্যবাদী, বৈষম্যহীন সমাজ তথা রাষ্ট্র তৈরি করতে পারবো। দেখা যাক কতো দ্রুত এগুলো শুরু হয়।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে বৃহস্পতিবার রাতে শপথ নিয়েছে ১৬ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তিনদিন আগে আশফাক নিপুনের সঙ্গে আলাপকালে তার কাছে প্রশ্ন ছিল কেমন হওয়া উচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? তিনি বলেন, ‘আমার মতে অবশ্যই জনবান্ধব, সাহসী এবং সক্ষম ব্যক্তিদের থাকা উচিত। তাদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা থেকে বেরিয়ে দেশ ও মানুষের জন্য কল্যাণে যারা কাজ করবে তাদের অন্তর্ভুক্তি দরকার সবার আগে। সবারই ভাবতে হবে, সবার আগে দেশ।’
আশফাক নিপুন বলেন, “২০ কোটি মানুষ হয়তো দেশকে ভালোবাসে। কিন্তু প্রত্যেকে এই অবস্থানে সার্ভিস দিতে পারবে না। আমি চাচ্ছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত ক্ষমতা নিয়ে সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় আনবেন। গত ১৫ বছরে প্রশাসনের সিস্টেমের মধ্যে দুর্নীতি ও দলীয়প্রীতি থেকে নিয়োগ হয়েছে তাদের বাতিল করে যোগ্য জনশক্তি আনতে হবে। কিছু মানুষ হয়তো পালিয়ে গেছে কিন্তু সিস্টেমের কোনায় কোনায় ভূত রয়ে গেছে। এগুলো সরাতে সময় লাগলে লাগুক, তারপর গণমুখী নির্বাচন দেয়া হোক।”
দীর্ঘ আলাপ মোড় নেয় আশফাক নিপুনের গল্প বলার স্বাধীনতা ও ‘মহানগর’ প্রসঙ্গে। তিনি বললেন এভাবে,“আমাদের প্রাক ঐতিহাসিক সেন্সরবোর্ড আছে। যারা চাইলেই যে কোনো সিনেমা আটকে দিতে পারে। শনিবার বিকেল, কাঠগোলাপ, নমুনা, অমীমাংসিত- সিনেমাগুলো সেন্সরে আটকে আছে। অনেক সিনেমা কাটছাঁট করে ছাড়া হয়। স্বাধীন ফিল্ম মেকিংয়ে এই সেন্সর বোর্ড সবচেয়ে বড় অন্তরায়। নতুন স্বাধীনতা অর্জনে আমি আশা করবো, সেন্সর বোর্ড প্রথা উঠে সেন্সর সার্টিফিকেশন চালু হবে। যেখানে গ্রেডিং দিয়ে বলা থাকবে কোন সিনেমা কোন বয়সের দর্শকের উপযোগী।”
‘মহানগর’ প্রসঙ্গে নিপুন বলেন, এটা বানানোর সময় ভেবেচিন্তে বানাতে হয়েছে। স্বাধীনতা ছিল না বলে অনেক ইস্যু দেখাতে পারিনি। জনগণ চায় মহানগরের একটার পর একটা সিরিজ আসতে থাকুক। তাদের এই চাওয়াটাকে আমি রেসপেক্ট করি। ১৯ বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে যখন ফিল্ম মেকিং করতে ঢাকা আসি, তখন ভাবি নাই যে আমার একটি সিরিজ বা চরিত্র কিংবা সিনেমার জন্য মানুষ এতো আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে। এটা আমার জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমন চাপের। আমি সারাজীবন মানুষের আশীবার্দের চাপে থাকতে চাই। গাড়ি -বাড়ি, সম্পদ আসবে যাবে, কিন্তু মানুষের আশীবার্দ পাওয়া দুষ্কর। মানুষের ভালোবাসার চাপের কারণ এখন আমাকে অনেক বুঝশুনে কাজ করতে হয়।
অনেকে মনে করেন, রাজনীতি ও প্রশাসনের গল্পে ‘মহানগর’ বানাতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষোভ থেকে প্রতিবাদে সরব হতেন আশফাক নিপুন। এই ধারণার ব্যাখ্যা নিপুন দিলেন এভাবে, “গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ টিকে থাকার জন্য লাগামহীন দুর্নীতি করেছে। হাজার কোটি টাকা পাচার, ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বস, ছাত্রলীগের দৌরাত্ম থেকে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে গুমের রাজনীতি। ২০০৯ সালে জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারকে বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ১৫ বছরে তারা কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া কিছু করেনি। বরং মানবিক ও সাম্যের সমাজ গড়তে, সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করেনি। জনগণ অনেক সময় দিয়ে না পেরে অবশেষে স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। আমার পক্ষ থেকে এসবের শৈল্পিক প্রতিবাদ থেকে ‘মহানগর’ বা এর আগে টিভিতে কাজগুলো করেছি সেগুলো।”
আলাপকালে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভবিষ্যতে আশফাক নিপুন কী রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন? বললেন,“আমরা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ লালন করি। তা না হলে চায়ের দোকানগুলো পর্যন্ত রাজনৈতিক আলাপে জমে উঠতো না। বাকি ২০ কোটি মানুষের মতো আমিও রাজনৈতিক আলাপ পছন্দ করি কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক নেতা হওয়ার গুণাবলি বা প্রজ্ঞা হয়তো আমার মধ্যে নেই। আমি ফিল্ম মেকার, এই কাজের মাধ্যমে আমি নিজের কথাগুলো বলে যেতে চাই।”
প্রতিবাদে সরব থাকা আশফাক নিপুনকে ‘সংস্কৃতি মন্ত্রী’ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা আদনান আল রাজীব। নিজের ফেসবুকে বিষয়টি জানিয়ে আদনান পোস্ট দেন। সেখানে নির্মাতা অমিতাভ রেজা মন্তব্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখতে চেয়েছেন নিপুনকে। এই বিষয়টিও উঠে আসে নিপুনের সঙ্গে আলাপকালে। শুরুতে তিনি বিষয়টি মজা করা বলে উল্লেখ করলেন। তবে সত্যি যদি সুযোগ আসে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবেন জানতে চাইলে হাসিমুখে আশফান বলেন, “শুরু থেকে আমি প্রতিবাদ করে আসছি এটার জন্য হয়তো তারা মজা করে বলেছে। এই দায়িত্ব পালন করার জন্য দেশে হাজারগুণ যোগ্য মানুষ আছেন। আমি শুধু আমার কাজটা (ফিল্ম মেকিং) ঠিকঠাক ভাবে করতে পারলে খুশি। আর আপনি যেহেতু সুযোগ পেলে বললেন, তাহলে মজা করেই বলি সেক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয়েরকে প্রাধান্য দেব। এখানে সিনেমা, সেন্সর থেকে গণমাধ্যম সবকিছু আছে। তথ্য মন্ত্রণালয় এত গুরুত্বপূর্ণ যে গত ১৫ বছরে দেখেছি কত দুর্নীতি করা হয়েছে। এই আন্দোলনেও সবগুলো গণমাধ্যম চাপে পড়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। দু-একটি গণমাধ্যম ছাড়া অধিকাংশ বিগত স্বৈরশাসকের প্রেসক্রিপশনে চলেছে। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত। কারণ, তথ্য প্রাপ্তি জনগণের মৌলিক অধিকার। সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এসবের উন্নয়নের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবার আগে। সিরিয়াসলি আমি বরং চাইবো যেই আসুক, আমি যেন মানুষের পক্ষে থেকে তার সমালোচনা করতে পারি। আমার জন্য এটা হবে আদর্শ স্থান। আমি মনে হয় আজন্ম বিরোধী দল। স্রোতের অনুকূলে থেকে আমি কোনো মজা পাই না। বিপরীতে থাকলে মানুষের কথা বলা যায়।”
কথায় কথায় আশফাক নিপুনের কাছ থেকে জানা যায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরব থাকায় তাকে একবার উঠিয়ে নেয়ার কথা উঠেছিল। কিন্তু সহধর্মীনি এলিটা করিম আগলে রাখেন নিপুনকে। বললেন,“কদিন আগে আন্দোলনের সময় আমার মুভমেন্ট এর কারণে আমাকে একবার উঠিয়ে নেয়ার কথা আসে। সেবার এলিটা নিজ উদ্যোগে আমি যেন নিরাপদ থাকি সেটা নিশ্চিত করেছে। আমি জানতাম আমাকে ঝামেলা পোহাতে হবে। এজন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী সংগীতশিল্পী এলিটার জন্য ব্যাপারগুলো ছিল অন্যরকম। আমি হয়ত শহীদ হতে প্রস্তুত, কিন্তু এলিটা তো আমাকে শহীদ হতে দিতে প্রস্তুত না। সে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কীভাবে আগলে রাখা যায় সেদিক সবসময় খেয়াল রাখে। মানুষ আমার কাজগুলো পছন্দ করে। আমি বলি, এর ৯০ শতাংশ অবদান এলিটার। বাকি ১০ ভাগ আমিসহ যারা কাজগুলোর সঙ্গে জড়িত থাকেন তাদের অবদান। এলিটা আমাকে সবসময় স্পেস দিয়েছে, সব ধরনের চাপ নিজের উপর নিয়েছে। ক্রিয়েটিভ কাজে সহধর্মীনির কাছ থেকে এই সাপোর্টটা সবচেয়ে বেশি দরকার। এজন্য আমি যতবার পুরস্কার পাই, সবকিছু এলিটাকে উৎসর্গ করে দেই।”
সবশেষে আশফাক নিপুন জানান, তার আসন্ন কাজের আপডেট। তিনি বললেন, হইচই-এর জন্য ‘জিম্মি’ নির্মাণের কাজ করছি। জয়া আহসানের প্রথম ওয়েব সিরিজ হতে এটি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে শুটিং পিছিয়েছে। নইলে এ মাসেই শুরু হতো। এছাড়া সিরিজ, সিনেমা একটার পর একটা করার জন্য লাইন আপে আছে। এগুলোর পাশাপাশি প্রতিকূল সময়ে ‘মহানগর’ বানিয়েছিলাম। মানুষের প্রত্যাশা, অনুকুল সময়ে যেন আরও সাহস করে মহানগরের নতুন সিজন বানাতে পারি, সেই বিষয়েও কাজ করে যাচ্ছি।









