গুম ও জুলাই আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিদেরকে (সেনা কর্মকর্তা) গ্রেপ্তার করে আদালতে (ট্রাইব্যুনালে) হাজির করার ব্যাপারে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছে বলে উল্লেখ করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের দুই মামলা ও জুলাই আগস্টে রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠাতে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশের পর সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।
এসময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আজকে যাদেরকে উপস্থিত করা হয়েছিল তাদেরকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে ও বিচারের সোপর্দ করার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন কাজ করেছেন, তেমনিভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসাবে আমরা যাদেরকে মনে করি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, তারা এই আদালতের (ট্রাইব্যুনালের) বিচারিক প্রক্রিয়াকে সাহায্য করেছেন। তারা (সেনাবাহীবী) ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ল’ অফ দ্য ল্যান্ডের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের সমস্ত সমর্থন থাকবে। তারা সেই সমর্থন আমাদেরকে দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছেন।’
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আসামিদেরকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করতে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছে। সুতরাং দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে নিয়ে যারা অপপ্রচার করেন, তাদেরকে বলবো অপপ্রচার করবেন না। তারা জুলাই আগস্টে নিরস্ত্র ছাত্র জনতা হত্যাযজ্ঞের সময় ঢাল হয়ে রুখে দাড়িয়েছিলেন, তা জাতি স্মরণ করে। এখন গুমের বিচারেও সহযোগিতা করছে।’
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের দুই মামলা ও জুলাই আগস্টে রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক আরেক মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আজ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আজ যে ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আজ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (এখন অবসরকালীন ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ওবিজিবির সাবেক কর্মকর্তা মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
এদিকে এই তিন মামলার পলাতক অপর আসামীদের ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে গুমের দুই মামলায় পরবর্তী শুনানির জন্য ২০ নভেম্বর ও রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পরবর্তী শুনানির জন্য ৫ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই ট্রাব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আজকের আদেশের পর সকাল ১০ টায় গ্রেফতার ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারের উদ্দেশ্য ট্রাইব্যুনাল থেকে বিশেষ প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। আসামী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সেনানিবাসে যে সাবজেল ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে এদের নেয়া হবে বলে জেনেছি।’
ট্রাইব্যুনালে আজ প্রসিকিউসন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম শুনানি করেন। অন্যদিকে আসামী পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন।
এর আগে বুধবার সকাল ৭ টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ জেলের একটি বিশেষ প্রিজন ভ্যানে করে সাধারণ পোশাকে ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।সেনা কর্মকর্তাদের ট্রাইব্যুনালের আনার প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এপিবিএনের বিপুল সংখ্যক সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। এছাড়া রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, কাকরাইল মোড়সহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে গত ৮ অক্টোবর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এছাড়া ওইদিন ট্রাইব্যুনাল জুলাই আগস্টে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম মুনসহ চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমনে নেন। সেই সাথে এই তিন মামলায় পরোয়ানাভুক্ত আসামীদের ২২ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর গত ১১ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে ১৫ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার কথা জানায় সেনাবাহিনী। আর্মি অফিসার্স মেসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান বলেন, দুটি মামলার ৩০ জন আসামির মধ্যে ২৫ জনই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে নয় জন অবসরপ্রাপ্ত, একজন এলপিআরে গেছেন এবং বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৫ জন।
পরবর্তীতে ঢাকা সেনানিবাসের একটি ভবনকে সাময়িকভাবে কারাগার ঘোষণা করে গত ১২ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব মো. হাফিজ আল সাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৫৪১(১) এর ক্ষমতাবলে এবং দি প্রিজন অ্যাক্ট এর ধারা ৩ এর বি অনুসারে ঢাকা ঢাকা সেনানিবাসের বাশার রোড সংলগ্ন উত্তর দিকে অবস্থিত ’এমইএস’ বিল্ডিং নং-৫৪-কে সাময়িকভাবে কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হলো’।









