অর্জনের গল্পটা তখনও ছিল ১৯৮৬ সালের। মেক্সিকোতে ডিয়েগো ম্যারাডানোর হাত ধরেই আর্জেন্টিনার ঘরে এসেছিল বিশ্বকাপ শিরোপা। এরপর আর হয়ে ওঠেনি সোনালী ট্রফি ছোঁয়া। অপেক্ষাটা ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে শিরোপার কাছে গিয়েও তা ছোঁয়া হয়নি আলবিসেলেস্তেদের। আট বছর পরের গল্পটা সবারই জানা। কাতারের লুসেইল স্টেডিয়ামে সোনালী ট্রফিটা শোভা পেয়েছিল রোজারিও থেকে ওঠে আসা লিওনেল মেসির হাতে।
মেসি কিংবদন্তি বনেছিলেন আগেই। তবে অভাব ছিল কেবল সোনালী ট্রফিটির। ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বয়সে যে সেই আক্ষেপ মিটে যাবে তা হয়তো মেসি নিজেও ভাবেননি। কাতারে পড়ন্ত বয়সেও উড়ন্ত ছিলেন মেসি। ম্যাজিক্যাল পারফরম্যান্সে মেসি হয়ে ওঠেছেন অবিনশ্বর। সোনালী ট্রফিটিও যে ধরা দিয়েছে তার হাতে।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। কাতারের জাতীয় দিবসে দোহা, কর্নিছ ও কাতারাল ক্যালচারাল ভিলেজ আকাশী-সাদা ভক্তদের উল্লাসে মেতে উঠেছিল লুসেইল আইকনিক স্টেডিয়ামে ইতিহাস লিপিবদ্ধের রাতে। যে উল্লাস কয়েকগুণ বেশি হয়েছিল বুয়েনস এইরেসে। রোজারিওতেও সেদিন বয়েছিল আনন্দের ধারা। তাদেরই সন্তান, রোজারিও’র অলি-গলিতে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকা ছোট্ট ছেলেটি আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, চির শ্বাশত।
মেসির জীবনের লড়াইটা ছিল জীবনের শুরু থেকে। হরমোনজনিত সমস্যায় হয়তো সেখানেই থেমে যেত কিংবদন্তি হয়ে ওঠার পথযাত্রা। তবে ভাগ্য-বিধাতার লিখনীতে ছিল ভিন্ন গল্প। ছোট্ট মেসি নজরে আসেন বার্সেলোনার। লা মাসিয়ায় নতুন সংসার শুর করেন রোজারিও’র ছেলেটি। তারপরের গল্প সবারই জানা। কিংবদন্তি বনে যাওয়া। জীবনের ৩৫টি বছর পেরিয়ে গেলেও অর্জনের ঝুলিতে ছিল না কেবল ওই একটি শিরোপা। আর্জেন্টিনার শিরোপা না জেতার সময়টাও ছিল প্রায় তারই সমান। অবশেষে তা করে দেখিয়েছেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে মেসিদের শুরুটা সুখকর হয়নি। সৌদি আরবের কাছে অনাকাঙ্খিত পরাজয়। সেদিন অনেকেই বলেছিলেন গ্রুপপর্ব থেকেই হয়তো বিদায় নেবে আর্জেন্টিনা। ৩৫ বর্ষী মেসি তখন আশাহত হননি। সতীর্থদের নিয়ে এঁকেছেন নতুন ছক। ড্রেসিংরুম শেয়ার করা ভাই-বন্ধুরাও হতাশ করেনি তাকে। মেক্সিকো-পোলান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউটে পৌঁছায় আলবিসেলেস্তেরা।
নকআউটে ফুটবল বিশ্বকাপ যেন নতুন এক মেসিকে দেখেছে। এরআগেও চারটি বিশ্বকাপ খেলেছিলেন মেসি। তবে নকআউটে গোলের দেখা পাননি কখনো। কাতারে গ্রুপপর্বে পোলান্ড ম্যাচ ছাড়া বাকী সবগুলো ম্যাচেই জাল ছুঁয়েছেন এই মহাতারকা। ফাইনালে করেছিলেন জোড়া গোল।
নাটকীয়তায় ফাইনাল টাইব্রেকারে গড়ালেও শেষ হাসিটা হেসেছিল আর্জেন্টিনাই। বীরত্বগাঁথা এঁকেছিলেন সেদিন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। অতিরিক্ত সময়ের যোগকরা সময়ে কোলো মুয়ানির শট ঠেকিয়ে দিয়ে যেন মনে করিয়ে দেন মেসির ৩৫তম জন্মদিনে দেয়া কথার বিষয়টা। বলেছিলেন, মেসিকে বিশ্বকাপ জেতাতে প্রাণ দিতেও রাজী। আর সেটাই করেছেন। এরপর টাইব্রেকারেও নায়ক বনেছেন মার্টিনেজ। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন কিংসলে কোম্যানের শট। ফলাফল সবারই জানা।

কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি গোল করেছিলেন সাতটি। পাশাপাশি করেছেন তিন অ্যাসিস্ট। ফাইনালে গোল করেন দুটি। গোটা টুর্নামেন্টে অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্সের ফলে মহাতারকার হাতে উঠেছিল গোল্ডেন বলের পুরস্কার।
বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত অর্জনেও অনন্য এলএম টেন। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় শীর্ষে উঠে যান লিওনেল মেসি। সেমিতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ছুঁয়েছিলেন লোথার ম্যাথিউসের ২৫ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। কাতারে শিরোপা নিশ্চিতের রাতে চ্যাম্পিয়ন মেসি খেলেছেন ২৬টি ম্যাচ।
ফুটবল বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সময় খেলার পাশে নিজের নাম লিখতে লিওর প্রয়োজন ছিল ২৪ মিনিট, ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলেছেন পুরো ১২০ মিনিট। এতে সর্বোচ্চ সময় মাঠে থাকার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। পাওলো মালদিনির ২,২১৭ মিনিট পেছনে ফেলে ২,৩১৪ মিনিট খেলা মেসি আছেন শীর্ষে।

এক বছর আগে লুসেইল স্টেডিয়ামে শিরোপার মঞ্চে উত্তেজনার পারদ চড়েছিল তুঙ্গে। খেলার ৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ফ্রান্স সমতায় ফেরে ৮১ মিনিটে। এমবাপের জোড়া গোল আর্জেন্টিনাকে থমকে দিলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। মেসি ফের লিড আনলে শেষ সময়ে পেনাল্টি থেকে আবারও সমতায় আনে ফ্রান্স। মেসির জোড়া গোল ও এমবাপের হ্যাটট্রিকে শেষ সমাধান আসে টাইব্রেকারে। ৪-২ শট ব্যবধানে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।







