ভারতের বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) প্রয়াত হয়েছেন চলচ্চিত্র অ্যাক্টিভিস্ট, নির্মাতা ও শিক্ষক জাহিদুর রহিম অঞ্জন। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া গুণী অঞ্জনের ষাটেই পরলোক যাত্রা মেনে নিতে পারছেন না সতীর্থরা। চলচ্চিত্রকর্মী, নির্মাতা থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য অনুরাগী অঞ্জনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন- স্মৃতিচারণ করছেন ব্যক্তিগত দেয়ালে।
শুধু তাই নয়, ভারতের পুনে ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে পড়ালেখা এবং চলচ্চিত্র অ্যাক্টিভিস্ট হওয়ার সুবাধে তার বন্ধুত্ব ছাপিয়ে গেছে দেশের সীমারেখা! স্বাধীন চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ের সাথে তার ছিলো বিশেষ সখ্যতা। বিশেষ করে উপমহাদেশে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত, এমন বহু প্রবীন-নবীনের সাথে ছিলো তার হৃদ্যতা।
অঞ্জনের প্রয়াণে একটি প্রতিবেদন ছেপেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। যেখানে বন্ধু অঞ্জনের হঠাৎ চলে যাওয়ায় বাকরুদ্ধ পুনে ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের সহকর্মী বন্ধুরা।
ভারতীয় চিত্রগ্রাহক অমিত সেন বলেন,“আমরা ১৯৯০ সালে এফটিআইআই থেকে স্নাতক হই। অঞ্জন পরিচালনা বিভাগে ছিলেন, আর আমি চিত্রগ্রহণ নিয়ে পড়েছি। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তার অকাল প্রয়াণ বিশাল এক ক্ষতি।”
এফটিআইআই-র দিকনির্দেশনা ও চিত্রনাট্য বিভাগের প্রধান সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় জানান,পাঁচ মাস আগে দিল্লিতে অঞ্জনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, যখন তিনি চিকিৎসার জন্য ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “অঞ্জন মুক্তচিন্তার মানুষ ছিলেন। মণি কৌল ছিলেন তার গুরু… এনএসডি থেকে স্নাতক হওয়ার পর ইরফানকে আমরা দুজনই আমাদের নিজ নিজ ডিপ্লোমা ছবির প্রধান চরিত্রে নিয়েছিলাম। আমরা তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম… ২০২০-তে ইরফান চলে গেল, আর এখন অঞ্জন।”
সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (এসআরএফটিআই) সম্পাদনা বিভাগের প্রধান (প্রাক্তন) শ্যামল কর্মকার অঞ্জন ও তার স্ত্রী, লেখক শাহীন আখতারের সঙ্গে সাক্ষাৎ সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “আমি এফটিআইআই-তে তার কয়েক বছরের সিনিয়র ছিলাম এবং আমরা প্রায়ই একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। ঠিক মহামারির আগে, আমরা দুজনই রাজশাহীতে ঋত্বিক ঘটক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম।”
এসআরএফটিআ-র চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রসেনজিৎ ঘোষ এফটিআইআই-তে অঞ্জনের এক ব্যাচ জুনিয়র ছিলেন। সোমবার রাত থেকে তাকে অসংখ্য ফোনকল পেতে হচ্ছে বলে জানান। তিনি বলেন, “আমি তার ডিপ্লোমা ফিল্মে সহকারী হিসেবে কাজ করেছি, যেখানে মণি কৌলের মেয়ে শম্ভবী ছিলেন প্রধান চরিত্রে। অঞ্জনের অনুপ্রেরণায় আমি আমার এসআরএফটিআই ডিপ্লোমা ফিল্ম সপ্তম বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জমা দিই, যেখানে এটি নির্বাচিত হয়। আমাদের বন্ধুত্ব ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও, আমরা অটুট বন্ধুত্ব বজায় রেখেছি।”
সম্প্রতি তোলা অঞ্জনের সাথে একটি ছবি শেয়ার করে ভারতীয় নির্মাতা, শিক্ষক সরোদ রাজ লিখেছেন,“এটা সত্যিই শোকাহত করার মতো খবর। স্তব্ধ এবং বাকরুদ্ধ। এটা মেনে নেওয়া যায় না, জাহিদুর রহিম অঞ্জন। তার একটি সিনেমা বাংলাদেশে শিগগিরই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তার মতো সুস্বাদু গরুর মাংসের কারি খুব কম লোকেই রান্না করতে পারত! এই শোক কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। শান্তিতে যাত্রা করো, বন্ধু।”
অঞ্জনের সাথে নিজের একটি স্থিরচিত্র আপলোড করে রাশিয়ান চিত্র সমালোচক সের্গেই আনাশকিনও স্মরণ করেন মেঘমল্লার নির্মাতাকে। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “আমার ভালো বন্ধু বাংলাদেশি চিত্রপরিচালক অঞ্জন আর নেই। ২০১৪ সালে ঢাকায় দেখা হয়েছিল তার ছবি ‘মেঘমল্লার’, ২০১৬ সালে প্রকাশিত আমার বইতে সেই সিনেমার আলোচনা রয়েছে। তিনি শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সত্যিকারের শিক্ষিত এবং উচ্চ সংস্কৃতিবান মানুষ। ইউরোপীয় সিনেমা সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখতেন।”
কথা সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ গল্প অবলম্বনে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘মেঘমল্লার’ নির্মাণ করেন অঞ্জন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এটি ছিলো তার প্রথম ফিচার ফিল্ম। প্রথম ছবির জন্যই তিনি ‘শ্রেষ্ঠ পরিচালক’ ও ‘শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা’ হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলন কর্মী, শর্টফিল্ম ফোরামের সাবেক সভাপতি ও চলচ্চিত্র শিক্ষকের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক ও স্মৃতিচারণ করছেন চলচ্চিত্রের সহকর্মী থেকে অগনিত মানুষ। অঞ্জনের দাম্পত্য সঙ্গী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার।
১৯৬৪ সালের ২৭ নভেম্বর জন্ম নেয়া অঞ্জন ১৯৮৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৯০ সালে ভারতের পুনে ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে ‘ডিরেকশন এন্ড স্ক্রিপ্ট রাইটিং’-এর উপর স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এছাড়াও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (বিসিটিআই), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।









