মৃণাল সেন। অসংখ্য কালজয়ী সিনেমার স্রষ্টা। যার কাছ থেকে সিনেমার প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’র নির্মাতা, অভিনেতা অঞ্জন দত্ত। মৃণাল সেনের ‘চালচিত্র’ সিনেমার মধ্য দিয়ে যে অঞ্জন পা রেখেছিলেন সিনেমার দুনিয়ায়। যার কাছ থেকে পেয়েছিলেন পৃথিবী দেখার তরতাজা চোখ!
সেই গুরু মৃণালকে নিয়ে তার শতবর্ষে সিনেমা নির্মাণ করলেন শিষ্য অঞ্জন দত্ত। নাম রাখলেন ‘চালচিত্র এখন’। শুধু পরিচালনা নয়, সিনেমাটিতে মৃণাল সেনের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয়ও করলেন অঞ্জন। সেই সঙ্গে সিনেমাটির প্রযোজনায় পয়সাও খরচ করলেন অঞ্জন, সঙ্গে ছেলে নীল দত্ত!
গুরুকে উৎসর্গ করে নির্মিত সিনেমাটি এখনোও মুক্তি পায়নি। এরআগে গেল ডিসেম্বরে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শীত হয়, জিতে নেয় সমালোচক পুরস্কারও! দ্বাবিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এবার ‘চালচিত্র এখন’ দেখলো বাংলাদেশের দর্শক! যথারীতি সিনেমাটি হয়েছে তুমুল প্রশংসিত। শুক্রবার বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তনের হল ভর্তি দর্শক দেখলো সিনেমাটি।
তারআগে উপস্থিত থেকে সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের উদ্দেশে কথা বলেন অঞ্জন। জানান, কেন তিনি নিজে খরচা করে সিনেমাটি বানানোর উদ্যোগ নেন। অঞ্জন বলেন,“আমার সাথে যখন মৃণাল দা’র পরিচয় হয়, তখন তার বয়স ৫৭ বছর; আর আমার ২৪। তাকে নিয়ে আমি এবং আমার পুত্র নীল নিজেরা খরচা করে এই ‘চালচিত্র এখন’ ছবিটা বানিয়েছি। এই ছবিটা করতে গিয়ে কারো কাছে আমরা টাকা চাইনি। কারণ আমাদের মনে হয়েছিলো, এই ছবিটা আমাদের মতো করে এভাবে কেউ করতে দিবে না। তাই আমরা রিস্ক থাকা সত্বেও করেছি।”
গুরু মৃণাল সেনের সাথে কয়েক দশকের সম্পর্ক ছিলো তার। তবে কখনোই অঞ্জনের কোনো সৃষ্টিতে মৃণাল আলাদা করে জায়গা পায়নি। কেন পায়নি, সে কৈফিয়তও এদিন দিলেন অঞ্জন। বললেন,“আমার কোনো গানে, আমার কোনো সিনেমায় এবং আমার কোনো থিয়েটারে মৃণাল সেন আসেনি। কেন আসেনি আমি জানি না। তিনি এতোই ব্যক্তিগত, দূর থেকে তাকে দেখতে আমার অনেক সময় লেগেছিলো। দূর থেকে না দেখলে আমি কী করে তাকে নিয়ে ছবি করবো!”
অঞ্জন বলেন,“মৃণাল সেনকে আমি মহান ব্যক্তি হিসেবে দেখি না। মানুষ হিসেবেই দেখি। সেটা আমার কাছে খুব বড় পাওয়া। সময় লাগলো তাকে দূর থেকে দেখতে। তার একশো বছরে আমি এই ছবিটা করেছি।”
পৃথিবীর সিনেমা দেখার দরোজা খুলে দিয়েছিলেন মৃণাল, সেটা বলতে গিয়ে এদিন অঞ্জন বলেন,“মৃণাল সেন না থাকলে আমি সিনেমায় আসতে পারতাম না। তিনি আমার পৃথিবীর সিনেমার দরোজাটা খুলে দিয়েছিলেন। আমার সিনেমা করার কোনো ইচ্ছে ছিলো না। উনি প্রায় জোর করে আমায় ঢুকিয়েছিলেন। তারপরে ধীরে ধীরে উনার সহকারি হলাম, অভিনেতা তো হলাম ই, উনার গল্প লিখতাম, স্ক্রিনপ্লে, উনার এক্সকিউটিভ প্রডিউসার হলাম, বন্ধু হলাম। শেষ সিনেমা অবধি অনেক বছরের সম্পর্ক তার সাথে।”
‘চালচিত্র এখন’ নির্মাণ প্রসঙ্গে এসময় অঞ্জন বলেন, এই ছবিটি শুধু মৃণাল সেন কিংবা আমার গল্প নয়। আমার মনে হয়, এটি দুটো প্রজন্মের গল্প। যে প্রজন্ম দুটি আলাদা, ভিন্ন- কিন্তু তারা অনেকদিন একসাথে চলতে পারে। জেনারেশনের বাধা টপকে, বয়সের তফাৎ এড়িয়ে দুটো মানুষ কাছে আসতে পারে। সেটা স্পোর্টসম্যান হতে পারে, মিউজিশিয়ান হতে পারে- ‘চালচিত্র এখন’ এর ক্ষেত্রে সেটা অঞ্জন দত্ত ও মৃণাল সেন।
ছবি: মিতুল আহমেদ








