ইতিহাস সব সময় বিজয়ীদের মনে রাখে, কিন্তু মহাকাল মনে রাখে সংগ্রামীদের। আজ মঙ্গলবার ৩০ ডিসেম্বর যখন বেগম খালেদা জিয়া পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন তখন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান বা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হলো না বরং সমাপ্তি ঘটল এক অভাবনীয় আখ্যানের। যে আখ্যানের শুরু হয়েছিল লাজুক এক গৃহবধূর হাত ধরে আর সমাপ্তি ঘটল এক নিঃসঙ্গ ক্লান্ত কিন্তু অনমনীয় রাষ্ট্রনায়কের বিদায়ের মধ্য দিয়ে।
আজকের সংবাদ শিরোনামে হয়তো তাঁর মৃত্যুর সময় আর কারণ লেখা থাকবে, কিন্তু যা লেখা থাকবে না, তা হলো ক্ষমতার শিখর আর পতনের খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর নীরব দহন।
ক্যান্টনমেন্টের ছায়া থেকে রাজপথের রোদে
১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন, তখন বেগম খালেদা জিয়া ৩৫ বছরের এক নারী ও দুই সন্তানের জননী। রাজনীতি তো দূরের কথা, জনসম্মুখে আসতেই যিনি সংকোচ বোধ করতেন। স্বামী জিয়াই ছিলেন তাঁর জগত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই অন্তর্মুখী নারীকেই নামতে হলো রাজপথে।
অনেকে ভেবেছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর আবেগকে পুঁজি করে তিনি হয়তো কিছুদিন রাজনীতিতে থাকবেন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল জিয়ার বিধবা স্ত্রী নন, তিনি নিজের পরিচয়েই এক অগ্নিকন্যা। আশির দশকে যখন বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদরা স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে আপস করছেন, তখন একা দাঁড়িয়েছিলেন খালেদা। তাঁর সেই একরোখা জেদ থেকেই জন্ম নিল ‘আপসহীন’ উপাধি। সেই সময় তিনি যদি আপস করতেন, হয়তো ক্ষমতার ভাগ পেতেন সহজেই, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথ।
মাতৃত্ব বনাম নেতৃত্ব: এক বিয়োগান্তক দ্বন্দ্ব
বেগম জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখান্ত সম্ভবত তাঁর মাতৃত্ব। রাজনীতি তাঁকে দিয়েছে দেশের শীর্ষ ক্ষমতা, ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’র খেতাব; কিন্তু কেড়ে নিয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত সুখ।
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তাঁর জীবনে যে ঝড় আসে, তা আর থামেনি। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো যখন মারা যান, তখন তিনি গৃহবন্দি। সন্তানের লাশ দেখার জন্য মায়ের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর শেষ বিদায়ের দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায় হয়ে আছে। অন্যদিকে বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি হয়তো চেয়েছিলেন সন্তানদের পাশে রেখে একটু শান্তি, কিন্তু রাজনীতি সেই সুযোগ তাঁকে দেয়নি। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তারেক রহমানের দেশে ফেরা যেন সেই দুঃখান্তরই এক নাটকীয় সমাপ্তি—মা অপেক্ষা করেছিলেন পুত্রের জন্য, কিন্তু পুত্র ফিরে পেলেন মায়ের নিথর দেহ।
ফিরোজার চার দেয়াল ও একজন একাকী মানুষ
গত এক দশকে আমরা যে বেগম জিয়াকে দেখেছি, তিনি নব্বইয়ের দশকের সেই তেজদীপ্ত নেত্রী নন। তিনি ছিলেন অসুস্থ, ধীর এবং অনেকটাই একা। গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ ছিল তাঁর একাকীত্বের সাক্ষী। যিনি একসময় লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে ভাষণ দিতেন, তাঁর শেষ জীবন কেটেছে হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর হুইলচেয়ারের সীমাবদ্ধতায়।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি আজীবন লড়াই করেছেন, কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি নিজেই কি খুব বেশি গণতন্ত্র বা ন্যায়বিচার পেয়েছিলেন? এই প্রশ্নটি ইতিহাসের পাতায় অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
ইতিহাসের পাতায় তাঁর অবস্থান
বেগম খালেদা জিয়া কেবল বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজেও একজন নারী তাঁর দৃঢ়তা দিয়ে কোটি মানুষকে পরিচালনা করতে পারেন। তাঁর শাসনামলে নারী শিক্ষা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার দায়ভার নিয়ে যে বিতর্ক, তাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ, মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে, সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আসে তাঁর সেই অদম্য সাহস—যিনি বলেছিলেন, “আমার গন্তব্য একটাই, আর তা হলো বাংলাদেশ।”
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি যুগের সমাপ্তি। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক অমলিন শিক্ষা—রাজনীতি কোনো ফুলের বিছানা নয়, বরং কাঁটার মুকুট। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটাই আসল। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি বেঁচে থাকবেন এমন এক চরিত্র হয়ে, যাকে ভালোবাসা যায়, ঘৃণা করা যায়, কিন্তু কখনো উপেক্ষা করা যায় না।









