স্বাগতম হে মাহে রমজান

বিজ্ঞাপন

মুহাম্মদ সৈয়দুল হক

বিজ্ঞাপন
তোমারে সালাম করি নিখিলের হে চির-কল্যাণ—
জান্নাতের পুণ্য অবদান!
যুগ-যুগান্তর ধরি বর্ষে বর্ষে আসিয়াছ তুমি
দিনান্ত কিরণে চুমি
ধরণীর বনান্ত বেলায়।
[কবিতা: রমজান, কবি শাহাদাৎ হোসেন]
আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত নিয়ামতের সুসংবাদ নিয়ে পবিত্র রমজান মাস আমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে। এই এক মাসের গুরুত্ব ও ফজিলতের উপর যেভাবে বিশদ বিবরণ পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এসেছে, অন্য কোনো মাস সম্পর্কে তেমন বর্ণনা দেখা যায় না। এ মাসের এমন কিছু বিশেষত্ব আছে, যেগুলো সচরাচর অন্যান্য মাসে পাওয়া যায় না৷ হাদিসে পাকে এসেছে, “আল্লাহর কসম, মুসলমানদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে উত্তম কোনো মাস নাই।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ৮৩৬৮)

এ মাসের বিশেষ পরিচিতি দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “রমজান ঐ মাস, যে মাসে আমি মানুষের হেদায়েতের জন্য কুরআন নাজিল করেছি। এতে রয়েছে সুপথ প্রাপ্তির পথনির্দেশ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী সুস্পষ্ট বিবরণ। অতএব, তোমাদের মাঝে যে এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে।” (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)

কুরআন নাজিলের মাস হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবার পরপর আল্লাহ তায়ালা যে নির্দেশটি আমাদের দিয়েছেন, তা হচ্ছে রোজা রাখার নির্দেশ। সুতরাং, রমজান আর রোজা অবধারিতভাবেই একে অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই যোগাযোগকে আরো দৃঢ় করছে সুরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে, “হে ইমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর। এ কারণে যে, যেন এটির মাধ্যমে তোমরা মুত্তাকি হয়ে উঠতে পারো।”

বলাবাহুল্য, ‘মুত্তাকি’ হয়ে উঠার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর ভয় মনে সঞ্চারিত থাকা। যে সঞ্চারণের ফলে একজন বান্দা কখনো গুনাহের কাজে ধাবিত হতে পারে না। অন্যায় কাজে অগ্রসর হতে পারে না। পরের হক নষ্ট করতে পারে না। এবং এই সমস্তই অর্জিত হয় বান্দা যখন একান্ত মনে আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোজা রাখে। নজরুল বলেছেন,

বিজ্ঞাপন

“এই এক মাস রোজা রেখে

পরহেজ থাক গুনাহ্ থেকে

কিয়ামতের নিয়ামত তোর ঝুলি ভরে তোল।”

দেখা যাচ্ছে, এই রমজানে রোজা রাখার ফলে কেবলই উপবাস থাকা হয় না, এর মাধ্যমে আরো ব্যাপক কল্যাণ সাধিত হয়। এমনই কিছু কল্যাণের কথা হজরত আবু হুরায়রা (রা.)—এর বর্ণনায় নবীজির হাদিসে এসেছে এভাবে—

“যখন রমজান মাস আগমন করল, তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমাদের নিকট মহা বরকতময় মাস রমজান উপস্থিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানদের শিকলে বন্দি করা হয়।

এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে তো প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৭১৪৮)

উপরের হাদিস থেকে রমজান মাসে একটি বিশেষ রাত সম্পর্কে আমরা অবগত হলাম, যাকে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, সে রাত হলো “লাইলাতুল কদর।” ইরশাদ হচ্ছে, “লাইলাতুল কাদরি খায়রুম মিন আলফি শাহর।” অর্থাৎ, পবিত্র কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। কুরআন ও হাদিসের অকাট্য সমর্থনে আমরা এই মাসেই সে রাতকে পেতে চলেছি, যা অন্য কোনো মাসে পাওয়ার সম্ভাবনা নাই।

শুধু লাইলাতুল কদর নয়, বরং রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত সীমাহীন মূল্যবান। কেননা এ মাসের প্রতিটি আমলের সাওয়াব অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি। ‘বায়হাকি’র বর্ণনায় এসেছে, রমজান মাসের একটি নফল ইবাদতের সাওয়াব অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদতের সমান। আর রমজান মাসের একটি ফরজের সাওয়াব অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান। ‘বায়হাকি’র অন্য বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা চাইলে এই সাওয়াব সাত’শ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারেন। অতএব, এই মাসে বেশি বেশি নেক আমল, যেমন— নামাজ, রোজা, তসবি-তাহলিল, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দান-খয়রাতের বিকল্প নাই।

এ মাসের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হিসেবে আল্লাহ তায়ালা ব্যাপকহারে ক্ষমা করেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ইমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা পালন করবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে (বুখারি শরিফ, হাদিস নং ১৯০১)

একই ধরনের হাদিস ইবনে মাজাহ শরিফেও বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ইমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখে এবং রাতে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করা হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৩২৬)

রমজান এভাবেই কখনো কুরআনের সুসংবাদ, কখনো অশেষ ফজিলত, কখনো সাওয়াবের আধিক্য, কখনো মাগফিরাতের ঘোষণা নিয়ে আমাদের নিষ্কলুষ করে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এর বিপরীত। রমজান আসে অসীম সম্ভাবনা নিয়ে, কিন্তু সে-সব সম্ভাবনা আমাদের হেলার কারণে দেখতে দেখতে অতিক্রান্ত হয়ে যায়। আমরা যে অবস্থায় রমজান শুরু করি, সে অবস্থাতেই রয়ে যাই। অথচ, আমাদের উচিত মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এমন অমোঘ সুসংবাদের যথাযথ কদর করা। কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটি বলেছেন—

“এলো রমজানেরি চাঁদ এবার দুনিয়াদারি ভোল

সারা বরষ ছিলি গাফেল এবার আঁখি খোল।”

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

কুরআন নাজিলের মাসবরকতরমজান মাসরহমতহাদিস