টেলরের আত্মজীবনী জুড়ে ‘বর্ণবাদের শিকার’ হওয়ার কথা

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন এবছরই। টাটকা স্মৃতির মাঝে মন খারাপ করা সব কথা সামনে আনলেন রস টেলর। দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে নিউজিল্যান্ডের হয়ে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন, ৩৮ বর্ষী কিংবদন্তি আত্মজীবনীতে তুলে এনেছেন সেসব কথা। ‘ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট’ নামের জীবনী কথায় বিস্ফোরক সব বিষয়ই সামনে এনেছেন টেলর।

টেলর নিউজিল্যান্ডের নাগরিক হলেও তার পূর্বসূরিরা ছিল সামোয়ার বাসিন্দা। সূত্র ধরেই তিনি বাদামী বর্ণের। বর্ণ বিষয়টি তাকে কতটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে, আত্মজীবনীতে সেসবই বলেছেন। দলের ভেতরের পরিবেশ বোঝাতে ড্রেসিংরুমকে ‘বর্ণবাদী লকাররুম’ অভিহিত করেছেন। একইসঙ্গে কিউই দলের কিছু কর্মকর্তার অপ্রত্যাশিত বর্ণবাদী মন্তব্যের বিষয়টি লিখেছেন।

‘ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটে’ টেলর লিখেছেন, ‘ক্যারিয়ারের বেশিরভাগটা জুড়েই আমি এমন এক অসঙ্গতিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ছিলাম, যেখানে ঊর্ধ্বমুখী যাত্রায় আমার বাদামী চেহারা সবসময়ই একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে চ্যালেঞ্জটা হল, এমন অনেককিছুই ঘটে যা আপনার সতীর্থ বা সমর্থকদের কাছেই সহজে প্রতীয়মান নয়।’

কিউইদের সাবেক ব্যাটারের দাবি, অনেকেই তাকে মাওরি আদিবাসী কিংবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত বলে ধরে নিয়েছিলেন। কারণ নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের প্রতিনিধিত্ব খুবই বিরল। সামোয়ান সম্প্রদায়ের হওয়ার পরও তাই অনেকে তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।

ড্রেসিংরুমে ‘অতিমাত্রায়’ বর্ণবাদী আচরণ ও বিদ্বেষমূলক পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন টেলর। বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কায় তখন মুখে কুলূপ এঁটেছিলেন। খেলোয়াড়ি জীবনে ড্রেসিংরুমে কেমন ধরনের প্রহসনের শিকার হয়েছিলেন, আত্মজীবনীতে সেসবের বিবরণ দিয়েছেন টেলর।

‘এক সতীর্থ আমাকে বলেছেন, রস, তুমি অর্ধেক ভালো মানুষ। কিন্তু কোন অর্ধেকটা ভালো? তুমি জানো না আমি কী বোঝাচ্ছি।’

‘‘অন্য খেলোয়াড়দেরও তাদের জাতিসত্তা নিয়ে করা বাজে মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে। সম্ভবত একজন (নিউজিল্যান্ডের শ্বেতাঙ্গ) এ ধরনের মন্তব্য শুনে ভাববে ‘ওহ, এটা সামান্য বকাঝকা মাত্র, ঠিকই আছে।’ তবে তিনি মন্তব্যটি সাদা চামড়ার মানুষ হওয়ায় নিজস্ব মনোভাব নিয়ে শুনছেন। তার উপর মন্তব্যটি তাকে লক্ষ্য করেও করা হয়নি। তাই এটির পাল্টা প্রতিক্রিয়াও নেই, ভুল শুধরে দেয়ার মানসিকতাও নেই।’’

‘যখনই বিষয়টি সামনে তুলে ধরবেন, তখনই মাথায় আসবে এটি সমস্যাকে আরও বাড়াবে। বর্ণবাদের মতো বিষয়কে আলোচনার খোরাক বানিয়ে সেটিকে কার্ড বানিয়ে খেলার জন্য আপনি অভিযুক্ত হবেন। গণ্ডারের চামড়া বানিয়ে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু এটা কি আদৌ সঠিক কাজ?’

নিউজিল্যান্ড দলের একজন সাবেক ম্যানেজার এবং কোচ অনিচ্ছাকৃতভাবে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন বলেও দাবি টেলরের। তার স্ত্রীকে সেই ম্যানেজার বলেছিলেন, ‘যেসব খেলোয়াড়দের পূর্বসূরিরা মাওরি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের ছিল, তাদের আর্থিক সমস্যা আছে। সেজন্য অনেকে তার কাছে আর্থিক সাহায্য চায়।’

আত্মজীবনীতে টেলরের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের একজন মুখপাত্র দেশটির শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে বলেছেন, ‘বর্ণবাদী আচরণের ব্যাপারে নিন্দা জানাই। নিউজিল্যান্ড হিউম্যান রাইটস কমিশন বর্ণবাদের পক্ষে কোনো ক্যাম্পেইন করে না। রসের এই ধরনের আচরণের জন্য আমি ভীষণ হতাশ।’

প্রায় ১৬ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ১১২ ম্যাচে ১৯৬ ইনিংসে ৪৪ গড়ে টেলর করেছেন ৭,৬৮৪ রান। ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি মিলিয়ে রঙিন পোশাকে মোট ৩৩৭ ম্যাচ খেলেছেন। ২০০৬ সালে নেপিয়ারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডেতে অভিষেক। মিডলঅর্ডারে পরে ২৩৫ ওয়ানডেতে ৪৭ গড়ে করেছেন ৮,৫৯৩ রান। আছে ২১টি শতক ও ৫১টি অর্ধশত রানের ইনিংস।

২০০৬ সালের শেষদিকে ছোট সংস্করণে টেলরের অভিষেক, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। পরে দীর্ঘ ১৪ বছরে ১০২টি টি-টুয়েন্টি খেলেছেন। ২৬ গড়ে ১,৯০৯ রান করেছেন। সেঞ্চুরি নেই, ৭টি ফিফটি আছে।

বিজ্ঞাপন

নিউজিল্যান্ডবর্ণবাদরস টেলরলিড স্পোর্টসসামোয়া