‘অ্যান্ডারসন জুনিয়র’ থেকে আজকের মুনিম শাহরিয়ার

যুব ওয়ানডেতে তাসকিন আহমেদের সঙ্গে নতুন বলে জুটি বেধে বোলিং করেছেন। বেশকিছু ম্যাচে সাদমান ইসলামের সঙ্গে নেমেছেন ওপেনিংয়ে। জিম্বাবুয়ের সোনালী প্রজন্মের অন্যতম কাণ্ডারি নিল জনসনের মতো ভূমিকা ছিল মুনিম শাহরিয়ারের। দুদিকেই সুইং করাতে পারদর্শী হওয়ায় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ রিচার্ড ম্যাকিঞ্জ ‘অ্যান্ডারসন জুনিয়র’ নামে ডাকতেন। একদশক আগের সেই অ্যান্ডারসন কীভাবে আগ্রাসী ব্যাটার মুনিম শাহরিয়ার হয়ে উঠলেন, সে গল্পই উঠে এসেছে একান্ত আলাপচারীতায়।

বিপিএল মাতিয়ে টি-টুয়েন্টি দলে এলেন। দুটি ম্যাচও খেলেছেন। যদিও সেভাবে নিজেকে মেলে ধরা হয়নি। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বিদেশ সফর সামনে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ নিয়ে নিশ্চয়ই রোমাঞ্চিত?
মুনিম: ২০১৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলতে গিয়েছিলাম গায়ানাতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর বাংলাদেশের উইকেট অনেকটা কাছাকাছি। আশা করছি ভালো কিছু করার। এখানে অনুশীলন করছি। সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাড়ছে পরিশ্রম। ওখানে গিয়ে যতটা সময় পাই চেষ্টা থাকবে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে ভালো খেলার।

টি-টুয়েন্টির সঙ্গে আপনার ব্যাটিং খুব মানানসই। পাওয়ার প্লে’র সমাধান মনে করা হচ্ছে আপনাকে। যখন ব্যাটিংয়ে নামেন এটি কি মাথায় থাকে?
মুনিম: টি-টুয়েন্টিতে যেটা ফিল করি, যে রোলটা থাকে, আমি যে পজিশনে খেলি চেষ্টা থাকে টিমকে একটা ভালো স্টার্ট দেয়ার। হতে পারে ৩০-৪০-৫০-৬০-৭০ রান। যেকোনো কিছু হতে পারে। তবে শুরুটা যেন ভালো হয়, সে চেষ্টা করি।

বাংলাদেশ দলে নিজের মতো করে খেলার স্বাধীনতা কতটা পেয়েছেন?
মুনিম: কোচদের ওরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমাকে বলা হয়েছে তোমার যে স্ট্রেন্থ সে অনুযায়ী খেলো। সেটা ট্রাই করি।

বিপিএলে ফরচুন বরিশালের হয়ে একের পর এক ঝড়ো ইনিংস খেলেন মুনিম। তার আগে ডিপিএল টি-টুয়েন্টিতেও দেখান পেশির জোড়

অনেকে বিপিএল মাতিয়ে জাতীয় দলে আসে, তারপর হারিয়ে যান। বেশিদিন টিকে থাকতে পারেন না। ফিনিশারের ভূমিকায় আরিফুল হক যেমন এসেছিলেন আচমকা, আবার আচমকাই হারিয়ে গেলেন!
মুনিম: আমার ক্যারিয়ার নিয়ে তো আমি চাইব দীর্ঘদিন যেন খেলি। ইচ্ছা বাংলাদেশকে অনেকদিন ধরে সার্ভিস দেয়ার। কিন্তু এটা তো আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। ভালো খেললে থাকব। না খেললে বেরিয়ে যেতেই হবে। এটাই সত্যি কথা। এটি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতে চাই না। জাস্ট প্রসেসের মধ্যে থাকার চেষ্টা করছি। সামনে যেটা আছে ওটা নিয়েই পরিকল্পনা করছি।

এমন একটা সময়ে জাতীয় দলে এসেছেন, একটা-দুইটা সিরিজ পরই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ। এখানে ভালো করে সুযোগটা নিশ্চয়ই নিতে চাইবেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজে তিনটি টি-টুয়েন্টির পারফরম্যান্স দেখেই হয়ত নির্বাচকরা দল গঠন করে ফেলবেন। কতটা সিরিয়াস আপনি?
মুনিম: এটা (বিশ্বকাপ) তো প্রত্যেকটা খেলোয়াড়েরই স্বপ্ন, যারা পেশা হিসেবে খেলছি ক্রিকেট। বিশ্বকাপে খেলা মানে সর্বোচ্চ লেভেলে খেলা। আমারও সে ইচ্ছাটা আছে। এখন ম্যাচ বাই ম্যাচ যদি ভালো খেলি, হয়ত সুযোগটা আসবে। আমি এটিই চাইব সামনে যেখানেই সুযোগ আসে যেন ভালো খেলি।

জাতীয় দলে আসার পর ক্রিকেট নিয়ে ভাবনার জগত কতটা বদলেছে?
মুনিম: এখনকার খেলোয়াড়রা যারা আছে সবাই ফিট। আমাকেও ফিটনেসের জন্য পরিশ্রম বাড়াতে হয়েছে। কিছু পরিবর্তন অবশ্যই এসেছে। আগে যেভাবে চিন্তা করতাম এখন হাই লেভেলে চিন্তা করা লাগতেছে। এখন চিন্তা করি আন্তর্জাতিক বোলারকে কীভাবে ফেস করব। আগে চিন্তা ছিল কীভাবে ডোমেস্টিক বোলারদের ফেস করব।

ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে পরিবারের সমর্থন ছিল?
মুনিম: অনেক সময় সমর্থন পাইনি অনেক সময় পেয়েছি। বাবা-চাচা সমর্থন দিয়েছেন। প্রথমে কঠিন ছিল পরে ঠিক হয়ে গেছে।

 

টি-টুয়েন্টিতে পাওয়ার প্লে’র সমাধান মনে করা হচ্ছে আগ্রাসী মুনিমকে

শুনেছি পেস বোলার হিসেবেই আপনি শুরু করেছিলেন, পরে কেন শুধু ব্যাটিংটাই বেছে নিলেন?
মুনিম: হ্যাঁ, পেস বোলার হিসেবে এইজ লেভেল শুরু করি। অনূর্ধ্ব-১৭, ১৯ দলে পেস বোলিং করেছি। তারপর ব্যাটিংয়ে বেশি ফোকাস করতে গিয়ে পেস বোলিংটা করা হয়নি। পেস বোলিংটা খুব ভালো করতাম। আউটসুইং-ইনসুইং দুটোই পারতাম। একবার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলাম। ৭ উইকেট পেয়েছিলাম অনূর্ধ্ব-১৬ বিভাগীয় পর্যায়ে। ওই ম্যাচে ওপেনিংয়ে নেমে ৮০ রানের মতো করেছিলাম। বোলিং যতই করি আসলে নিজেকে ব্যাটিং অলরাউন্ডারই মনে করতাম।

ছোটবেলায় কোনটাতে আগে বেশি সুনাম কুড়িয়েছেন, বোলিং নাকি ব্যাটিং?
মুনিম: যখন স্কুলে পড়তাম, মেইনলি পেস বোলার হিসেবেই প্র্যাকটিস শুরু করেছিলাম। সত্যি বলতে কী তখন তো জিনিসপত্র (ব্যাটিং সরঞ্জাম) কিনতে পারতাম না। একটা বল কিনতে পারলেই বোলিং করা যেত। যেহেতু পেস বল করতে পারি, ওটা নিয়েই পেস বল করতাম। ব্যাপারটা ছিল এরকম। সপ্তাহে পাঁচ দিন বোলিং আর দুই দিন ব্যাটিং করতাম।

বোলিং ধরে রাখলে কতদূর যেতে পারতেন বলে মনে হয়?
মুনিম: সেটি এখন বলা কঠিন। যেহেতু শুধু ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নিয়েছি। বোলিং নিয়ে আফসোস নেই। বোলিং নিয়ে মজার একটা ঘটনা আছে। ২০১৩ সালে যুব ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ খেলতে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম। তখন বিসিবি একাডেমির কোচ রিচার্ড ম্যাকিঞ্জ। নেটে বল করছিলাম। দুই দিকেই সুইং করাচ্ছিলাম। তখন কোচ আমার নাম দিয়েছিলেন অ্যান্ডারসন জুনিয়র (হাসি)।

আপনার ব্যাটিং টেকনিক টিপিক্যাল বাংলাদেশি ঘরানার মনে হয় না। অনেকটা ক্যারিবিয়ান স্টাইল। এটা কি সহজাত নাকি পরিশ্রমের ফল?
মুনিম: ছোট থেকে যে কোচের (হাবিবুর রহমান আলোক, এমসিসি ক্রিকেট কোচিং, ময়মনসিংহ) অধীনে প্র্যাকটিস করেছি তিনি ওইভাবে আমাকে তৈরি করেছেন একটু পজিটিভ খেলার জন্য। ওখান থেকে আস্তে আস্তে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে যখনই ব্যাটিং করতাম, আমার স্ট্রাইক রেট ভালো থাকত। বলের চেয়ে রান বেশি থাকলে ভালো লাগে। এই জিনিসটা আমার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। এজন্য আমার খেলার ধরনটা হয়ত এরকম।

 

অভিষেকের আগে জাতীয় দলের নেটে ঝড় তুলে কোচদের মুগ্ধ করেন মুনিম

টিভিতে কাদের খেলা বেশি দেখতেন? কাউকে ফলো করেন কিনা?
মুনিম: ছোটবেলায় অনেক ধরনের ব্যাটিং স্টাইল কপি করতাম। যাকে যখন ভালো লাগত, তার মতো করার চেষ্টা করতাম। বাংলাদেশে যারা আছেন তাদের ফলো করতাম। দেশের বাইরে গিলক্রিস্ট-হেইডেন। ছোটবেলায় গ্রায়েম স্মিথ, চন্দরপলের ব্যাটিংও কপি করতাম।

এই চর্চা কি পরবর্তীতে আপনাকে মাঠের চারদিকে বেশি বেশি স্ট্রোক খেলতে সাহায্য করেছে?
মুনিম: আমার তা মনে হয় না। আমার যে নিজস্বতা আছে, আমি তো কারো মতো না। নিজস্বতা, সেটা খুঁজে বের করা হল আসল জিনিস। যদি কারো মতো কপি করতে যাই, হয়ত পারব না। অনেকের অনেককিছু কপি করি না তবে দেখি কোন শটটা ভালো খেলতেছে। ওটা আমার মতো খেলার ট্রাই করি।

বিজ্ঞাপন

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরটি-টুয়েন্টি ওপেনারবাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজবিপিএল ২০২২মুনিমমুনিম শাহরিয়ারলিড স্পোর্টসস্পোর্টস বিশেষ