রসনা বিলাস এবং স্বেচ্ছাসেবী দুই তরুণ

‘বিদেশী দুই জন টেবিলে কিছুটা পড়ে থাকা খাবার তুলে নিয়ে ডাস্ট বাস্কেটে ফেলছে আর আমাদের কয়েকজন দেখ, কেমন হাসছে! বোকা নাকি এরা। শেখেনা কেন?’ কথোপকথনটা দুই তরুণের। কানে বাজে বেশ।

দুজনে শিক্ষার্থী। একজন ঢাকা কলেজে সম্মানের শিক্ষার্থী। ব্যবস্থাপনায় দ্বিতীয় বর্ষ। অন্যজন উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিবিএ করতে বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু তাদের পরনে প্রায় একই রঙের ফুলহাতা সোয়েটার। গলায় ঝোলানো মোটা সাদা ব্যান্ডের পরিচয়পত্র। সেই পরিচয়পত্রের নিচে লেখা ‘ফুড এন্ড বেভারেজ’। কৌতুহলী তাকানো দেখে একজন বলে ওঠে, ভাইয়া, সত্যি নিজের কাছে নিজে লজ্জা লাগছে ওদের কালচারাল প্র্যাকটিস দেখে। এখানে না আসলে বুঝতামনা।’

এ টেবিল থেকে সে টেবিলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। শামিয়ানা দিয়ে ছাওয়া পুরো জায়গাটি ফুডকোর্ট। ৫২ টি গোল টেবিলে ১০টি করে চেয়ার। ওরা ১২ জন কাজ করে এখানে। স্বেচ্ছাসেবা। যাদের সঙ্গে পরিচয় হয় সে দুজনের নাম সাব্বির আহমেদ এবং রাইয়ান হক রামীম। দুজনের বাড়ি মিরপুরে। পাঁচ দিনব্যাপী বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবের পঞ্চম আসরের চতুর্থ দিন। এবারই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রথম কাজ করছেন এ আসরে। এর আগে বেশ কিছু ইভেন্টে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করলেও এ ধরণের বড় আসরে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে অমৃত সমান।

স্বেচ্ছাসেবী দুই তরুণ সাব্বির আহেমদ (বাম দিকে) এবং রাইয়ান হক রামীম (ডান দিকে)

প্রতিদিন ১০০০টাকা করে সম্মানী। তবে তার চাইতে বড় প্রাপ্তি হিসেবে মনে করে তারা অভিজ্ঞতাকে। অর্থ অংকের সম্মানী না মিললেও তারা এখানে আসার সুযোগটা ছাড়তোনা বলে জানায়।

ফুড কোর্টের পাশে সারি করে ২২টি খাবারের স্টল। সেখান থেকে খাবার কিনে নিয়ে এসে এখানে বসে খাচ্ছে সবাই। ফুড কোর্টের সামনে বড় পর্দায় দেখা ও শোনা যাচ্ছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের হৃদয় জুড়ানো সংগীত উপস্থাপনা।

খাবারের জিনিসের দাম একটু নয়, বেশ উচ্চমূল্য। তারপরও কিনছে এবং খাচ্ছে সবাই। কারণটা সহজ। নিয়মিততো নয়। অস্থায়ী উৎসবে সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি খুব একটা ধর্তব্য নয়।

‘কি খাচ্ছে মানুষ বেশি?’ প্রশ্ন শুনে সাব্বিরের জবাব, ইন্ডিয়ান, চাইনিজ আর বাংলাদেশী খাবার বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ইন্ডয়ান দোসা খাচ্ছে সবাই বেশি। আর চাইনিজ চাওমিন আর দেশী লুচি-ভাজি এবং খিচুড়িটাও চলতে দেখছি।’ ফুটনোট দেয় রামীম। ‘মমটাও চলছে দারুন।’

আর দাড়ায়না দুই তরুণ। ৩০ নম্বর টেবিলে উচ্ছ্বিষ্ট ভরা খাবারের প্লেট পরে রয়েছে। সেটা তুলে ডাস্ট বাস্কেটে ফেলতে হবে। শেষ হয়ে যাওয়া পানির জার বদলে দিতে হবে। অন্য দিকে দৃশ্যমান দুজন ভিনদেশী নিজেদের শেষ হয়ে যাওয়া খাবারের থালা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন নির্দষ্ট জায়গায় ফেলতে।

রাতভর চলবে সুরের মূর্ছনা। মনে অনির্বচনীয় অনুভূতির তরঙ্গ সৃষ্টি হবে হয়ত। কিন্তু মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে কবে? জানি আসবে। আসতে হবে।

ছবি : অনিরুদ্ধ শান্তনু

উৎসব