‘রাজনৈতিক’ ধর্ষণ!

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে ভোলার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিভিন্ন গ্রামে যে তাণ্ডব চলেছে, তা সারা দেশের মানুষ দেখেছে। বহু মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, চোখ তুলে নেয়া, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো বিভৎসতা ওইসব গ্রামের মানুষ এখনও ভোলেনি। সংবাদ কাভার করতে গিয়ে অনেক ভিকটিমের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, নৌকায় ভোট দেয়ার ‘অপরাধে’ তাদের ওপর এই নৃশংসতা। কিন্তু দেড় যুগ পরে সেই নৌকায় ভোট না দেয়ার ‘অপরাধে’ নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন চার সন্তানের জননী।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ বলছে, পূর্বশত্রুতার জেরে এই ধর্ষণ। ২০০১ সালে ভোলায় যখন ওই নৃশংসতা চালানো হয়, তখনও তৎকালীন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এর সাথে রাজনীতি বা ভোটের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো পূর্বশত্রুতার জের। কিন্তু ‘পূর্বশত্রুতার জের’ জিনিসটা কী, তা তারা পরিষ্কার করে কেউ বলেননি।

এবার সুবর্ণচরে যে নারীকে গণধর্ষণ করা হলো, যার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের দগদগে ক্ষতচিহ্ন গণমাধ্যমে এসেছে, সেই নারী স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন (অনেকের কাছেই অডিও-ভিডিও রেকর্ড আছে) তাতে এটা স্পষ্ট যে, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।

তবে ২০০১ সালের সাথে ২০১৮ সালের পার্থক্য হলো, এবার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হয়নি। পুলিশ শুরুতেই এই ঘটনাকে পূর্বশত্রুতার জের বললেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। সেইসাথে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাৎক্ষণিকভাবে যে ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিও প্রশংসনীয়। ধর্ষণের ঘটনায় ইন্ধনদাতা হিসেবে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই নির্যাতিত নারীর চিকিৎসা ও পরিবারের পুনর্বাসনসহ সব ধরনের দায়িত্ব নিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী। কিন্তু ২০০১ সালে ভোলায় নির্যাতিতদের পাশে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার বা দলের কেউ দাঁড়িয়েছিলেন বলে শোনা যায়নি।

এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, এখন গণমাধ্যম কোনো খবর চেপে গেলে বা এড়িয়ে গেলে কিংবা ব্ল্যাক আউট করতে বাধ্য হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরগুলো চলে আসে। সাংবাদিকের ক্যামেরা কোনো কিছু মিস করে গেলেও সাধারণ নাগরিকের হাতে হাতে আছে মোবাইল ফোন এবং তার সাথে ইন্টারনেট। ফলে কে কখন কোথায় বসে কী ক্যামেরাবন্দি করবে এবং সেটি দ্রুত ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাবে, তা অনেক সময়ই আন্দাজ করা যায় না। সুবর্ণচরের ঘটনায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকার ও সরকারি দলের তরফে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পেছনে যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ একটি বড় ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

২০১৭ সালে রাজধানীর বনানীতে হোটেল রেইন ট্রিতে দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের বাবা, আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টা ধামাচাপা দিতে চাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। জবাবে তখন দিলদার আহমেদ বলেছিলেন, এটা এখন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় ব্যাপার ধামাচাপা দেয়া যায় না। অর্থাৎ এখন যেকোনো ছোট ঘটনাও মুহূর্তেই রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পরিণত হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যদি সেই ঘটনার ভিডিও, অডিও এমনকি স্টিল ছবিও থাকে। যেমন মাদকবিরোধী অভিযানে অনেক লোক নিহত হলেও কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হওয়ার আগ মুহূর্তের একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে পুরো অভিযানটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং মাদকবিরোধী অভিযানের গতিও ওই সময়ে শ্লথ হয়ে যায়। নিহত একরামুল যদি প্রকৃত অর্থে মাদক ব্যবসায়ী হয়েও থাকেন, দেখা গেলো যে একটি ফোনালাপের কারণে মানুষ তার ও তার পরিবারের প্রতি সংবদেনশীল হয়ে উঠলো। ফলে এখন যেকোনো কিছু করেই পার পাওয়া কঠিন।

২. ধর্ষণের বিচার যে হয় না, তাও না। কিন্তু তাতে ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে কই? সুবর্ণচরের গণধর্ষণের ঘটনা যখন গণমাধ্যমের শিরোনাম তখনই রাজধানীর গেন্ডারিয়া ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দুই শিশুকে হত্যার খবর এসেছে। ফেনীতে চার তরুণীকে ধর্ষণ, কুমিল্লায় চার সন্তানের আরেক মাকে গণধর্ষণ, কুষ্টিয়ায় নারী খেলোয়াড়কে ধর্ষণ—এসবই সাম্প্রতিক সংবাদ শিরোনাম।

প্রশ্ন হলো, একজন দুজন চারজন কিংবা আরও বেশি সংখ্যায় লোক কী করে ধর্ষণ বা গণধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের সাহস করে? তাদের মনে কেন ভয় তৈরি হয় না যে, এই ঘটনা অবশ্যই জানাজানি হবে এবং আদালত অবধি গড়াবে? তার মানে কি তারা দেশের প্রচলিত আইন কানুনও ভয় পায় না? তারা কি মনে করে যে, ক্ষমতার বলয়ে থাকলে ধর্ষণের মতো অপরাধেরও বিচার হবে না? তারা কি এটা বিশ্বাস করে যে, অপরাধ যত বড়ই হোক, তাদের রাজনৈতিক প্রশ্রয়দাতারা তাদের মুক্ত করে আনবে? নাকি এইসব অপরাধ করার সময় তাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না? তারা ঘটনার পরিণাম নিয়ে ভাবে না বা ভাবার মতো মানসিকতাই থাকে না? তারা কি ওই বিশেষ সময়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে? তারা কি আর তখন মানুষ থাকে না?

দুর্ভাগ্যজনক হলেও, এরকম ঘটনা যখনই ঘটে, তখনই এর গায়ে রাজনৈতিক রঙ দেয়া হয়। অনেক সময়ই তা সফল হয়। ফলে মূল ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। রাজনীতিকরণ হয়ে গেলে তখন একটি অপরাধও জাস্টিফায়েড হয়ে যায়। যেন ওই নির্দিষ্ট লোক বা নির্দিষ্ট বিশ্বাস ও আদর্শের লোককে ধর্ষণ বা নির্যাতিত করাটাই বৈধ। আশার কথা হলো, সুবর্ণচরে এই চেষ্টাটি হয়নি বা এরকম চেষ্টা করা হলে তা সফলও হত না। কারণ মানুষের নিজেদের চোখের বাইরেও এখন ক্যামেরা চোখ আরও বেশি সজাগ।

নোয়াখালীতে যে নারী ধর্ষণের শিকার হলেন, নিশ্চয়ই এর বিচার হবে। অপরাধীদের কেউ কেউ ক্রসফায়ারে নিহত হলেও দেশবাসী অবাক হবে না। কিন্তু এই নারীকে তো সারাজীবন এই বেদনার ভার, এই কষ্ট, এই দুঃসহ যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বাঁচতে হবে। সন্তানের সামনে তাকে একজন ধর্ষিতা মা হিসেবেই বেঁচে থাকতে হবে। সমাজের চোখেও তিনি করুণার পাত্র হয়ে থাকবেন। অন্য এলাকা থেকেও যখন সুবর্ণচর গ্রামে কেউ যাবে, তারা এই নারীর খোঁজ নেবেন। উৎসাহী কেউ কেউ তাকে দেখতে যাবেন। দশ বছর পরেও হয়তো তাকে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ চাইলেও তিনি এই চক্র থেকে বের হতে পারবেন না। গণধর্ষণের মতো নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা তিনি ভুলতে পারবেন না। তার স্বামী ও সন্তানরাও এই ট্রমার ভেতর থেকে বের হতে পারবেন না। সেইসাথে যে রাজনীতি ও ভোটের বলি হলেন এই নারী ও তার পরিবার, সেই রাজনীতির প্রতি তাদের যে ঘৃণা তৈরি হলো, তা থেকেও কোনোদিন তাদের মুক্তি মিলবে না। বস্তুত এভাবেই কোনো একটি বিষয়ের প্রতি ব্যক্তিমানুষের ঘৃণা অনেকের মধ্যে ছড়ায়। এভাবেই কি ঘৃণার সংস্কৃতি ঘর থেকে পাড়ায়, পাড়া থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে এবং রাষ্ট্র থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

দেশ একশ ভাগ ধর্ষণমুক্ত হোক—এই প্রত্যাশা নিশ্চয়ই সবার। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে কত বছর বা শতাব্দী লাগবে তা কেউ জানে না। একশো ভাগ শিক্ষিত এবং গণতান্ত্রিক দেশেও যে কোনো ধর্ষণ হয় না, তা নয়। বরং এ জাতীয় ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করেন বা ব্যবস্থা নেন, তারউপর নির্ভর করে সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমবে কি বাড়বে।

কোথাও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা যখন ঘটবে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ সেই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিলে, এর দ্রুত বিচার হয়ে গেলে, এরকম ঘটনায় রাজনৈতিক রঙ দেয়ার চেষ্টা না হলে, ধর্ষণকারী যেই হোক, তাকে ধর্ষক হিসেবেই সমাজ ও রাষ্ট্র বিবেচনা করলে, এ জাতীয় ঘটনা ধীরে ধীরে কমে আসবে।

ফলে ধর্ষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশা বিফলে যাবে, যদি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এরকম ঘটনায় সুবর্ণচরের মতো তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। এখন মূল চ্যালেঞ্জ সুবর্ণচরের ওই ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা এবং প্রচলিত আইনে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। সেইসাথে ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সহায়তা দেয়া যাতে তারা ধীরে ধীরে এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

নির্বাচন