ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: নিশ্চয়তা নাকি নিরাপত্তাহীনতা

নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও এরই মধ্যে পাস হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ২০০৬ সালে তথ্য প্রযুক্তি আইন, ২০১৩ সালে সেই আইনের সংশোধন এবং সর্বশেষ সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। নতুন আইনে তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০০৬’র অনেক বিষয় যেমন রয়েছে, একই সাথে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল ও নিরাপত্তা এজেন্সি গঠনের কথা রয়েছে এই আইনে।

সংশোধিত তথ্য প্রযুক্তি আইন-২০১৩ এর সবচেয়ে ভয়াবহ যে ধারাটি ছিলো তার নাম ৫৭। সেই ৫৭-এর দণ্ডের মাত্রা এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কমানো হলেও নিরপরাধ মানুষের হয়রানির ঝুঁকি কি আদৌ কমেছে? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে প্রথম থেকেই উদ্যোগ জানিয়ে এসেছে সম্পাদক পরিষদ। অনুসন্ধানী ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি হুমকি বলেও মনে করেন সম্পাদক পরিষদ।

আইনটি তথ্য অধিকার আইনের বেশ ক’টি ধারার সাথে সাংঘর্ষিক। প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে দুই দফায় সম্পাদক পরিষদ, টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো ও ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক করে সংসদীয় কমিটি। এই বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ খসড়া আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ধারার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপত্তি জানানোর কথা গণমাধ্যমে এসেছিলো। সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন সিপিজে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছিলো আইনটি নিয়ে সংসদে পুনরায় আলোচনা করার। কিন্তু সেগুলোতে তেমন কোন কাজ হয়নি।

১৯২৯ সালের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট আমাদের প্রাইভেসি বা নিরাপত্তা বিধানের জন্য এতকাল থেকে চলে আসছিলো। এই নতুন আইনেও সেই আইনের ছায়া বেশ প্রভাবশালী। ২০০৬ সালে প্রথম তথ্য প্রযুক্তি আইন করা হয়। শাহবাগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালে ৫৭ ধারা যোগ করে আইনটি সংশোধন করা হয়। এর ফলাফল আমরা এর মধ্যেই দেখতে পেয়েছি।

একটি গণতান্ত্রিক দেশের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মুক্ত গণমাধ্যম, অনলাইনের এ যুগে মানুষ যদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মতামতই প্রকাশ করতে না পারে তবে তা হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তে যুগান্তরের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যারা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তারা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।” এবারও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হওয়ার পর সরকার সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছে এই বলে যে সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু যে আইনের ১৪টি ধারা জামিন অযোগ্য তা নিয়ে সাংবাদিকদের চিন্তা না করলে কিভাবে চলবে?

৮ নম্বর ধারায় ডিজিটাল নিরাপত্তায় হুমকি সাধন করতে পারে এ ধরণের তথ্য ব্লক করার সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বিটিআরসিকে। আইন হওয়ার আগে বিডিনিউজ২৪ ডটকমকে এর খেসারত দিতে দেখা গেছে। ১৭, ১৮ ও ১৯ নং ধারায় তথ্য পরিকাঠামো, সার্ভার, কম্পিউটার সিস্টেমে বেআইনিভাবে প্রবেশ করলে, তথ্য সংগ্রহ করলে বা ক্ষতিসাধন করলে জেল, জরিমানার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাত্রই এই আইনের বেড়াজালে পড়তে পারেন। একই সাথে ৩২ ধারায় রয়েছে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্য কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ধারণ, সংরক্ষণ বা প্রেরণ করা যাবে না। করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশ্ন হলো এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির চিত্র তাহলে কিভাবে উঠে আসবে? আর যদি উঠেই না আসে তবে সুশাসন কিভাবে নিশ্চিত হবে? তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে তথ্য জানার আইনী অধিকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের রয়েছে। কিন্তু এই আইনের ফলে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ আসলে কতটুকু বলবৎ থাকে তাই দেখার বিষয়।

২৫ (খ) ধারায় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণ করার মতো কোন কিছু প্রকাশ করলে দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিংবা অন্যান্য আইনের মতো ভাবমূর্তি বা সুনাম এ শব্দদ্বয়কে ব্যাখ্যাতীত করে রাখা হয়েছে। কখন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে আর কখন হবে না সেটার জন্য কংক্রিট ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা না থাকলে কিভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা সতর্ক হবে?

২৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কোন কিছু প্রকাশ করলে সেটার বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। এখানেও কোন সংজ্ঞা কিংবা ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি আইনপ্রণেতারা।

এই আইনের একটা কালো দিক হলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহের বশবর্তী হয়েও পুলিশ কোন মানুষকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন। অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতাচর্চার একটা বড় সুযোগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। একই সাথে শাস্তির মাত্রাও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোন কোন ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

ডিজিটাল গণমাধ্যমের যুগে অবশ্যই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তার মানে এই নয় যে তা মুক্ত গণমাধ্যম বা মতপ্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ বা জনগণের জন্য ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা কোনভাবেই একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না। এর কারণে মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে চলে যাবে, যা জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এবারের নির্বাচনে তাই মানুষের আগ্রহের একটা জায়গা থাকবে আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ে কী বলা হচ্ছে। আশা করি গণতান্ত্রিক চর্চা সমুন্নত রাখতে এ বিষয়টিকে দলগুলো গুরুত্বের সাথে দেখবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন

৫৭ ধারাডিজিটাল নিরাপত্তা আইনতথ্য প্রযুক্তি আইন