করোনাভাইরাসের ঝুঁকি ও ধর্মের নামে অন্ধতা

ধর্ম মন্ত্রণালয় দেশের বিশিষ্ট আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে মসজিদে নামাজ বিষয়ে বিধিনেষেধ আরোপ করেছে। এসব বিধিনিষেধে বলা হয়েছে সাধারণ জামাতে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ পাঁচজন এবং জুমার নামাজে দশজনের জামাত হবে। ইতোমধ্যে সৌদিআরবে কারফিউ জারি করে মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দেশে দেশে শবে বরাতের নামাজও ঘরে পড়ার সিদ্ধান্ত হয়। শুধু মুসলিম নয় অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও একই রীতি প্রযোজ্য। রোগটি এমন যে এতে মারা গেলে জানাযা,দাহ তথা তথা সৎকারের জন্যও আপনজন উপস্থিত থাকতে চায়না। অথবা উপস্থিত হওয়ার সুযোগও থাকেনা৷ কারণ নিহতের নিকটজনদের চলে যেতে হয় লক-ডাউনে৷ সারা বিশ্ব জুড়ে এমনই এক ভীতিকর পরিস্থিতি চলছে। এমন মহামারির মুহুর্তে ধর্মীয় উপাসনা স্থগিতাদেশ নতুন কিছু নয়৷

মহামারীর কারণে আগেও হজ্ব বন্ধ হয়েছে। ১৮১৪ সালে হেজাজ প্রদেশে প্লেগের মহামারীতে ৮,০০০ মানুষ মারা যাওয়ায় হজ্ব বাতিল করা হয়। ১৮৩১ সালে ভারতবর্ষ থেকে যাওয়া হজ্বযাত্রীদের মাধ্যমে মক্কায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং চারভাগের তিনভাগ হাজী মৃত্যুবরণ করে। ফলে সে বছরও হজ্ব বাতিল করা হয়।

এছাড়াও ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে প্লেগ এবং কলেরার কারণে তিন বারে মোট ৭ বছর হজ্ব বন্ধ ছিল।যুগে যুগেই মহামারিতে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে এমন ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এবার করোনার মহামারিতে সন্ত্রস্ত গোটা পৃথিবী৷ সবাইকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী রাস্তায় নেমেছে জনসমাগম ঠেকাতে৷ শহরে গাঁয়ে পাড়ায় মহল্লায় সর্বত্রই ভয়ের ছাপ৷ মানুষকে সচেতন করার জন্য কত কী করা হচ্ছে। আর বিভ্রান্তিও কম ছড়ানো হচ্ছেনা।

একটি মহল জোর গলায় প্রচার করছে হায়াত মউত রিজিক দৌলত আল্লাহর হাতে। করোনা কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগসহ সমমনা ১৩টি ইসলামিক দল মানববন্ধন করে বলেছে, করোনা ভাইরাসকে ব্যবহার করে একটা শ্রেনী দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করতে চাইছে। দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। রাষ্ট্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করে সরকারকে পদত্যাগের পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।

সর্বোপরি মসজিদ, মাহফিল বন্ধ করে সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের খেপিয়ে তুলতে চাইছে। রহমত শূন্য করে দেশ ও সরকারকে খোদায়ী গজবের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। কিন্তু মসজিদে নামাজ মাহফিল বন্ধ কেন হলো? সেটা কি মানুষের সংক্রমণ ঝুঁকি কমানোর জন্য নয়? সম্প্রতি ভারতে মাওলানা সাদ মাহফিল করে নিজের ও অসংখ্য মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন। এমনটি না করে সতর্কতা পালন করে মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত রাখলে কি তা অধার্মিক হয়ে যেতো?

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ বলছেন, যারা মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণে বাধা দিয়েছে তাদের জন্যই করোনা। কেউ বলেছে যারা মসজিদ-মাদরাসা ভেঙ্গেছে নামাজ ও রোজায় বাধা দিয়েছে তাদের জন্যই করোনা। কেউ বলছে,মুসলমানদের কাছে করোনা আসবেনা। একজন ওয়াজকারী বলল, আমি কসম দিচ্ছি, মুসলমানদের কাছে করোনা আসবে না। যদি আসে আমার কাছ থেকে বুঝে নেবেন, যান…। যদি আসে… কোরআন মিথ্যা হয়ে যাবে”!

এভাবেই ধর্ম ও কোরআনের অপব্যবহার করে চলছে। বিতর্কিত করছে ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে। ঝুঁকিযুক্ত করছে মানুষের জীবনকে৷ ইউটিউবে এমন অনেক ওয়াজের ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথায় কথায় কোরআনে আছে কোরআনে নেই বলে কোরআনকে করছে অসম্মান।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকেই মসজিদে ছুটে যাচ্ছে। গোটা পৃথিবীর ভাবনা আজ করোনা নিয়ে৷ করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে ফিলিপাইনের পুলিশ। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আগুসান দ্যেল নর্তে প্রদেশের নাসিপিত শহরে সরকার ঘোষিত লকডাউন মানেনি এক ব্যক্তি। উপরন্তু কাস্তে হাতে নিয়ে গ্রাম কর্মকর্তা ও পুলিশকে হুমকি দিয়েছিল ওই ব্যক্তি।

ফলে ৬৩ বছরের ওই ব্যক্তিটিকে গুলি করতে বাধ্য হয় পুলিশ৷ গুলিতে লোকটি মারা যায়। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দ্যুতের্তে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে করোনা নির্দেশ না মানলে গুলি করার হুকুম দেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পাওয়ার তিনদিনের মাথায় গুলির ঘটনা ঘটেছে। এভাবেই দেশে দেশে কঠোরতা ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ করোনা একটি ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি। এখনও এর কোনো ভেকসিন আবিস্কার হয়নি।

হোম কোয়ারেন্টাইন ও সামাজিক দূরত্ব ছাড়া এর কোন প্রতিকার নেই। ভারতের কর্ণাটক রাজ্য সরকার কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষদের প্রতি ঘন্টায় সেলফি তুলে আপলোড করার নির্দেশনা দিচ্ছে। এসব ছবি পাঠাতে হয় রাজ্য সরকারের নির্দিষ্ট একটি সাইটে। এই নির্দেশনা না মানলে রাজ্য সরকারের একটি বিশেষ দল হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে আসবে বাড়ি থেকে।

এরপর তার স্থান হবে সরকারের গণ কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে। এমনই একটা জটিল সময়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে যারা মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়াটাই সংগত নয় কি? জুমার নামাজ, ওয়াক্তের নামাজ, শবেবরাতের নামাজ, ওয়াজ মাহফিল প্রভৃতিকে ঝুঁকিমুক্ত করা হোক। কারণ মানুষের জন্যই ধর্ম ধর্মের জন্য মানুষ নয়। ধর্মও নিশ্চয়ই তা মনে করে। সামনে রমজান মাস আসছে। আসছে তারাবির নামাজ। সরকারকে খুবই ভেবেচিন্তে এগুতে হবে। জনগণকেও হতে হবে সচেতন। নতুবা করোনার মহামারি এক করুণ পরিস্থিতিতে ফেলবে আমাদের।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন

করোনা ঝুঁকি ও ধর্মের নামে অন্ধতাকরোনাভাইরাসমতামত