এতো বড় ধৃষ্টতা!

স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী অন্দোলনে যে যুবক মৃত্যু ভয়কে পায়ে ঠেলে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে রাজপথে শহীদ হয়েছিলেন; সেই নূর হোসেনকে নিয়ে মশকরা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যে মেতেছেন স্বৈরাচার এরশাদের হাতে গড়া দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা।

আসলে শহীদ নূর হোসেনের আত্মদানের দিনটিতেই তাকে নিয়ে চরম ধৃষ্টতা আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন রাঙ্গা। গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল নূর হোসেনের মৃত্যু দিবস। ঠিক এইদিন রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র দিবস’র এক আলোচনা সভায় মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন? নূর হোসেন কে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেন্সিডিলখোর।’’

শুধু তাই নয়, ওই সভায় রাঙ্গা আরও বলেন, ‘‘নূর হোসেনকে নিয়ে গণতান্ত্রিক দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নাচানাচি করে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির গণতন্ত্রটা হলো এমন, যারা অতি ফেন্সিডিলখোর, ইয়াবাখোর, যারা ক্যাসিনোর ব্যবসা করে, তারাই হলো গণতন্ত্রের সোনার সন্তান। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখবেন নূর হোসেন দিবস। সেই নূর হোসেন চত্বর এরশাদ করেছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এরশাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক ছিলেন।’’

তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে মানুষ। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে এমন ‘আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য শুনে ঘরে থাকতে পারেননি শহীদ নূর হোসেনের মা। তার অন্য তিন ছেলেকে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান ধর্মঘটে বসেছেন। তাদের প্রশ্ন, এরশাদ নিজেও নূর হোসেনকে হত্যার জন্য তাদের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। সেখানে রাঙ্গা এই কথা বলার সাহস পায় কোথা থেকে?

রাঙ্গা ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তারা অবস্থান তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা জানি, ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বীর বিক্রমে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেদিন গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট এলাকায় পুলিশের গুলিতে যুবলীগ নেতা নূরুল হুদা বাবু, ক্ষেতমজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটোর সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন নূর হোসেনও। সেইদিনটিই হয়ে উঠে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিশিখা, অনুপ্রেরণার উৎস।

তাহলে ঘটনার এত বছর পর কেন মশিউর রহমান রাঙ্গার মতো সুবিধাভোগী নেতা নূর হোসেনকে নিয়ে এমন মন্তব্য করার দুঃসাহস দেখায়? যে দুটি মাদক দ্রব্যের কথা রাঙ্গা বলেছেন, তখন তো তার জন্মই হয়নি। হয়েছে আরো অনেক অনেক বছর পর। তাহলে কি শুধু নূর হোসেনের চরিত্র হননের জন্যই এমন মন্তব্য? তার খলনায়ক নেতা এরশাদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মহানায়ক নূর হোসেনকে এখনো ভয় পান বলে তাকে বিতর্কিত করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা?

আমাদের দুঃখ জীবন বিসর্জন দিয়ে নূর হোসেনরা এদেশে যে গণতন্ত্র আনতে চেয়েছিলেন; মশিউর রহমান রাঙ্গাদের মতো সুবিধাভোগী নেতাদের কারণে তা অধরাই থেকে গেছে। এমন ধৃষ্টতা আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের জন্য রাঙ্গাকে অবশ্যই শহীদ নূর হোসেন এবং তার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

শেয়ার করুন:
এরশাদনূর হোসেনমশিউর রহমান রাঙ্গাশহীদ নূর হোসেন