একবার না পারিলে দেখো সাতবার

ওয়ানডেতে প্রথম জয়ের দিনেই প্রথম শিরোপা!

একবার না পারিলে দেখো শতবার। মানুষকে অনুপ্রাণিত করা বা অনুপ্রাণিত হওয়ার এই অপ্তবাক্যটি এখন বাংলাদেশ দল এভাবে বলতেই পারে- একবার না পারিলে দেখো সাতবার। কেননা সাতবারের চেষ্টায় যে নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফির খোঁজ পেল টাইগাররা। বহুজাতিক টুর্নামেন্টে লাল-সবুজের বহু আরাধ্য শিরোপা।

বিজ্ঞাপন

ডাবলিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৪ ওভারে ২১০ রানের বড় লক্ষ্য ছোঁয়ার মঞ্চ ছিল বাংলাদেশের। মাশরাফীর দল তাতে উতরে স্বপ্নকে শোকেসে আনতে প্রথম শিরোপাটা ছুঁয়েছে ডাকওয়ার্থ ও লুইস পদ্ধতিতে ৫ উইকেটে জিতে, সেটিও ৭ বল হাতে রেখেই।

দুইশ পেরোনো লক্ষ্য তাড়ায় নেমে সৌম্য সরকারের ভিত গড়ে দেয়া ৪১ বলে ৬৬, মোসাদ্দেক হোসেনের হিসাব এলোমেলো করে দেয়া ফিনিশিংয়ে ২৪ বলে অপরাজিত ৫২, আর দুই সতীর্থের ফিফটির মাঝে সেতুগড়া মুশফিকুর রহিমের ২২ বলে ৩৬ রানে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে টাইগাররা।

যেটি নিজেদের ইতিহাসে লাল-সবুজদের প্রথম কোনো বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা। নিজেদের ক্রিকেটকে গৌরবের আরেকধাপে তুলে নেয়ার শিরোপা। নিজেদের ক্রিকেট সামর্থ্যকে নতুন করে জানতে পারার এক শিরোপা। আগে ছয়বার ফাইনালে উঠে প্রতিবারই ডুবতে হয়েছিল হতাশায়। যার চারটি ওয়ানডে টুর্নামেন্টে, আর দুটি টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে হতাশার গল্প।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঐতিহাসিক দিনটি তাই এলো দীর্ঘ বেদনাহতের গল্প লেখার পরই। শুরুটা হয়েছিল সেই ২০০৯ সালে, মিরপুরে। ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনাল ছিল, জয়ের পথটা বেশ তৈরি করেছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু মুরালিধরন নামের কালজয়ী স্পিনারটি সেদিন হয়ে উঠলেন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান! ১৬ বলে ৩৩ রান করে শ্রীলঙ্কাকে ২ উইকেটে জেতালেন বাংলাদেশের চোখ চিকচিক করা শিরোপাটা।

পরের গল্প সেই মিরপুরেই। ২০১২ সালের এশিয়া কাপ ফাইনাল। উড়ন্ত গতিতে ছোটা বাংলাদেশ শেষে এসে ধপাস! পাকিস্তানের কাছে ২ রানে ম্যাচ হাতছাড়া। সেদিন মাঠেই সাকিব-মুশফিকদের কান্নায় ভেঙে পড়া দৃশ্য শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদেরই নাড়িয়ে দেবে দৃশ্যপটে এলে।

মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে কম সাফল্য লেখেনি বাংলাদেশ। কিন্তু ট্রফির গল্প এলে সেখানকার ২২ গজ খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মতো অধ্যায়ের শেষও নেই! ২০১৬ সালে এশিয়া কাপ টি-টুয়েন্টির ফাইনাল তেমনই আরেকটি, ভারতের কাছে ৮ উইকেটে পরাস্ত টাইগাররা।

পরে আরেকটি ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের শিরোপা হাতছাড়া ওই চিরচেনা মিরপুরের সবুজ গালিচাতেই, ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কা যখন ৭৯ রানে ম্যাচ জিতে নিলো পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেলা বাংলাদেশের নাকের ডগা থেকে থেকে।

শিরোপা হাতছাড়ার সেই আরব্য রজনীর গল্প মিরপুর ছাড়িয়ে লঙ্কা-দুবাইয়েও বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৮ সালেই নিধাস ট্রফির ফাইনাল। টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে খেলা। কলম্বোয় ভারত জিতে গেল ৪ উইকেটে। দিনেশ কার্তিকের ছোট কিন্তু অতিমানবীয় এক ইনিংসের কাছে স্বপ্নভঙ্গ। পরের স্বপ্নভঙ্গ গত এশিয়া কাপে। দুবাইয়ে, আবারও প্রতিপক্ষ ভারত, শেষ বলে গড়ানো ফাইনালটা ৩ উইকেটে জিতে নেয় প্রতিবেশীরা।

এভাবে একের পর এক চড়াই-উতরাইয়ের গল্প লিখতে লিখতে পদ্মা-যমুনার জল কত গড়াল, কত ঘর-আবাদি জমি ভেসে গেল উন্মত্ত ভাঙনে, জেগে উঠল কত নতুন চর! সময়ের ফেরে তেমনি জেগে উঠল বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়ও। যাকে বলা যায় ট্রফি-অধ্যায়।

লাল-সবুজের ক্রিকেটে গৌরবের নতুন এই অধ্যায়টা আবার রচিত হল এমন একদিনে, ইতিহাস খুঁড়লে যে দিনটি অসাধারণ এক অতীত-রোমাঞ্চের গল্পে শিহরণ জাগাবে রোমকূপে!

বাংলাদেশ ডাবলিনের ম্যাচে মাঠে নেমেছিল ১৭মে তে। বৃষ্টি বিভ্রাটের কারণে যদিও ট্রফি জিততে জিততে তারিখটা ১৮ হয়ে গেছে। কিন্তু রেকর্ডে লেখা থাকবে ১৭-ই! আর এই ১৭ তারিখটাই টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবিস্মরণীয় আরেক ‘প্রথমে’র মঞ্চের দিকে।

কি সেই প্রথম? ১৭মে, ১৯৯৮ সাল। ভারতের হায়দরাবাদে সেদিন কেনিয়াকে ৬ উইকেটে হারিয়ে প্রথম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ পেয়েছিল লাল-সবুজরা। ২১ বছর পেরিয়ে আরেকটি ১৭মে। দুই ‘প্রথমে’র এই যোগসূত্র ইতিহাসের কোনো বার্তা নয়তো! ২১ বছর আগের সেই জয়ের পর গুটিগুটি পায়ে অনেকদূর এগিয়েছে বাংলাদেশের গৌরবগাথা। কে জানে, টাইগার ক্রিকেটে সাফল্যের ঊর্ধ্বগামী রেখাটা আরও অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার পথরেখাই হয়ত নির্ধারিত হল আরেকটি ১৭মে-তে।

ত্রিদেশীয় সিরিজবাংলাদেশ ক্রিকেট দললিড স্পোর্টস