একজন উপাচার্য এবং আমাদের দোষারোপের সংস্কৃতি

জাতি হিসেবে যে আমরা বড়ই হুজুগে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্রোত যে দিকে যায় আমাদের সে দিকে ছুটতেই হবে। ভাবছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে কিছু বলবো না। কিন্তু না বলে আর পারা গেলো না। বিষয়টাকে আমরা ফেসবুক ট্রায়াল তথা সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল থেকে এখন ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া ট্রায়ালের পর্যায়ে নিয়ে গেছি।

যাকে নিয়ে জোর আলোচনা তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে আমরা আমাদের মতো বলে যাচ্ছি। অনেক বেশি সরব দেখতে পাচ্ছি আমার পছন্দের দেশের শীর্ষ স্থানীয় এক জাতীয় দৈনিককে।

সাংবাদিকতার নৈতিকতার হিসেবে যদি বলতে যাই, বিচার হওয়ার আগে কোন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা সাংবাদিকতার নৈতিকতার বরখেলাপ। সে দিক থেকে যদি দেখতে যাই প্রিয় পত্রিকার ১ আগস্টে ‘উপাচার্য হতে আবারও আইন লঙ্ঘন’ এই লেখা নিয়ে আমার যথেষ্ট আপত্তি আছে। যেহেতু উপাচার্য নির্বাচন নিয়ে কোর্টে মামলা চলছিলো সেখানে আমি আইন লঙ্ঘন হয়েছে তা লিখে দেই কিভাবে। যারা লিখেছেন তারা নিশ্চয়ই আইন-আদালত বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে লিখেছেন। কিন্তু তাতে কি সাংবাদিকতার নীতি ঠিক থাকে?

বেশ কয়েকটি পত্রিকায় কিংবা টেলিভিশনে সূত্র হিসেবে এমন লোকদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, যারা সুবিধা ভোগ করে শেষমেশ ব্যাটে বলে না মেলায় উপাচার্য বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিংবা সাবেক উপাচার্য এসএমএ ফায়েজের উক্তি নিয়েছেন, যার বিরুদ্ধে রয়েছে আরো বেশি অভিযোগ। তাঁর ভিসি নির্বাচিত হওয়া নিয়েও অনেকে সেসময় আঙুল তুলেছিলেন। তিনি তো তার পরের জনের ভুল ধরতেই পারঙ্গমতা প্রদর্শন করবেন। সেটা কি বুঝতে কারো বাকি আছে?

আসুন উপাচার্যের ভুল ধরি। ডাকসু নির্বাচন নাকি তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তাঁর আগের কয়জন উপাচার্য ডাকসু নির্বাচন দিতে পেরেছেন? কিংবা আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের জায়গায় যদি বর্তমান সময়ে অন্য কেউ থাকতেন তিনি কি পারতেন ডাকসু নির্বাচন দিতে? প্রশ্ন রইলো সবার প্রতি।

সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের প্রতিটি সংগঠনের রঙ পরিবর্তন হয়। এটা বাংলাদেশের দোষ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে একটু তাকান, কয়টা প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের নীতিমালার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে? পুরো পৃথিবী জুড়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান মানেই সরকারের মতের পক্ষে কাজ করবে। আপনার ক্ষমতা কাঠামোই যদি ডাকসু নির্বাচন না চায়, সেখানে ব্যক্তি আরেফিন সিদ্দিককে দোষ দেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?

আগের ভিসিরা অনিয়ম করেছেন বলে আরেফিন স্যারও করলে তা বৈধ হবে মোটেও সেটা বলছি না। কিন্তু ঢালাও সমালোচনার মধ্যে স্যারের ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সেটা কোথায়? তা না হলে এ কেমন সাংবাদিকতা!

শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। প্রিয় পত্রিকাটি ‘অনুগতদের নিয়োগ দিতেই অনিয়ম’ বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখানেও তারা বারে বারে উপাচার্য বিরোধীদের মতামত নিয়েছে। রিপোর্টকে চাইলে নিজের আদর্শ অনুযায়ী তৈরি করা যায়। এখানে পত্রিকাটি সেই চেষ্টা কি করে নি?

ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, আজ প্রথম আলোর প্রধান প্রতিবেদনে স্যারের উপর অনিয়মের পাহাড় চাপিয়ে দেয়া হলো, অথচ স্যারের সামান্য একটা বিবৃতি নেয়ারও প্রয়োজনীয়তা দেখলেন না তারা। মনে হলো দায় সারতেই স্যারের বাসি একটা কথা ব্যবহার করা হচ্ছে। বাসি এ কারণে, দুই দিন আগেই একই কথা এই কাগজে ছাপা হয়েছে। স্যার নাকি ৯০৭ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন তার মেয়াদে। এদের মধ্যে একজনও পাওয়া গেলো না যে কিনা ঘটনার উল্টো পিঠটাও বলতে পারবে?

আমরা একটু রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই। সাবেক উপাচার্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের ডেকে এনে এনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। ইউজিসির প্রতিবেদনেই তা উঠে এসেছে। আরেফিন সিদ্দিকের বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ আছে কি?

আমরা সবাই ব্যক্তিকে দোষারোপ করছি। আমাদের দোষারোপ করার সংস্কৃতি এটা শিখিয়েছে। বাংলাদেশের বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদেরও একটু খোঁজ খবর নিয়েন। আরেফিন স্যার যোগাযোগে বিশেষজ্ঞ বলেই কিন্তু তাঁর দুয়ার সবার জন্য খোলা থাকে। যেকোন সমস্যায় আপনি তাঁকে পাশে পাবেন। তাঁকে যেহেতু জানার সুযোগ বেশি, দোষ খুঁজে বের করতেও সুবিধা। যাদের জানিই না তাদের দোষ বের করবো কিভাবে তাই না?

উপাচার্য হিসেবে স্যারের আমলের শিক্ষার্থী আমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে শুনেছিলাম ৭ বছরেও বেরুতে পারবো না পাশ করে। মাত্র ৫ বছরে মাস্টার্সসহ বেরিয়ে গেলাম। গোলাগুলি আর সন্ত্রাসী কার্যক্রমে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ৫ বছরে একবারও দেখি নি। স্যার শক্ত হাতে হাল না ধরলে হয়তো বা এমন হতো না। এমন নিরুত্তাপ বিশ্ববিদ্যালয় আগে কখনো ছিলো না।

গবেষক তৈরি হচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেন্টার ফর বাজেট এন্ড পলিসি, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ এগুলোর কার্যক্রম একদম কাছ থেকে দেখেছি। আরেফিন স্যারের তত্ত্বাবধানেই এগুলো নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম চালাচ্ছে। নতুন বিভাগ খুললেও দোষ। অথচ আমরাই প্রতিনিয়ত বলছি বিশ্ববিদ্যালয় পুরনো বিষয়গুলো নিয়ে আধুনিক দুনিয়ায় চলতে পারছে না। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সারা বাংলাদেশেই কমছে, কমছে গবেষণা। সেটার দায়ভারও কি স্যারের একার নিতে হবে?

সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের বাজেটে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা আর গবেষকদের জন্য কয়টি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে?

বঙ্গবন্ধুকে না জেনে আওয়ামী লীগে অনেক মন্ত্রী হয়েছেন, অনেকে রঙ পাল্টে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু স্যার কি কখনো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন? স্যার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ আর বঙ্গবন্ধুর জীবনাচরণে অনুপ্রাণিত বলেই কি বিরোধী পক্ষগুলো দোষ বের করতে না পেরে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছে?

কোন মানুষই দোষের ঊর্ধ্বে না, তবে কারো বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত যে ভাষায় আমাদের গণমাধ্যমগুলো ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের বিপক্ষে গান গেয়ে যাচ্ছে, তা কিন্তু সাংবাদিকতাকে মহিমান্বিত করছে না। সাংবাদিক ফ্যাক্ট বলবে, কিন্তু মানুষের বিপক্ষে রূঢ় ভাবে কথা বলা কোন প্রতিষ্ঠিত দৈনিককে মানায় না। গণমাধ্যমের কাছে অনুরোধ রইলো যাকে নিয়েই লিখি না কেন প্রমাণ ছাড়া মিডিয়া ট্রায়াল করে ইমেজ ধসিয়ে দেয়া বন্ধ হোক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকউপাচার্যঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যঢাবি ভিসি নির্বাচন