উৎসব সেরা চলচ্চিত্র তুরস্কের ‘জার’, সেরা বাংলাদেশি নির্মাতা তৌকীর

সময় সতত প্রবাহমান। অপেক্ষার ধার ধারেনা। জীবন যেমন পদ্মপাতায় টলমল জল। গানপোকার গানে বাজে বিদায়ের আবাহন। নয় দিনের উৎসব ফুরিয়ে এল। চোখের পলকে যেন। দেশ-বিদেশের প্রাণের উচ্ছ্বাস যেমন ছিল তেমনি কিছু অসঙ্গতিও লক্ষ্যণীয় ছিল। যা এমন মাপের চলচ্চিত্র উৎসবে কাম্য নয়। গান আর পুরস্কার ঘোষণায় শেষ হয়েছে ১৬ তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে দারসিম গণহত্যা নিয়ে নির্মিত তুরস্কের চলচ্চিত্র ‘জার’। সেরা নির্মাতাও তুরস্কের। ডাহা (মোর) চলচ্চিত্রের জন্য অনুর সায়ালক। এদিকে বাংলাদেশ প্যানারোমায় সেরা বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ‘সোহাগীর গয়না’ এবং ‘হালদা’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা নির্মাতা নির্বাচিত হয়েছেন তৌকীর আহমেদ। সেরা শিশু চলচ্চিত্রের পুরস্কার তুলে দিয়েছেন রাজশাহীর আড়ানীতে মাফলার উড়িয়ে ট্রেন দুর্ঘটনা ঠেকিয়ে দেওয়া দুই শিশু।

বিকালে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়। সাতটি ক্যাটাগরিতে ২৩টি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। শিশু চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে বাদল রহমান পুরস্কার জিতেছে ইরানের আলী গাবাতান পরিচালিত ‘হোয়াইট ব্রিজ’। বেস্ট অডিয়েন্স পুরস্কার জিতে নিয়েছে ভারতের প্রখ্যাত নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের পরিচালনায় ‘টোপ’।

নারী চলচ্চিত্র বিভাগে চারটি ক্ষেত্রে পরস্কার দেওয়া হয়েছে। সেরা নারী নির্মাতার ছবি মনোনীত হয়েছে রাশিয়ার কিরা কোভালেঙ্কোর পরিচালনায় ‘সোফিশকা’। প্রামাণ্য চিত্রে স্পেশাল মেনশন পুরস্কার জিতেছে নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্যেল নির্মাতা জুলিয়া দারের ছবি ‘থ্যাংক ইউ ফর দ্য রেইন’। নারী নির্মাতার সেরা প্রামাণ্য চিত্র পুরস্কার জিতেছে আফগানিস্তানের নির্মাতা ড. সারা কারিমির ‘পারলিকি’। স্পেশাল মেনশন ছোট ছবির পুরস্কার জিতেছে ফ্রান্স এর নির্মাতা এলিস ভিয়াল এর নির্মাণ ‘লেস বিগেরোনাক্স’। সেরা ছোট ছবির পুরস্কার জিতেছে চেক রিপাবলিকের নির্মাতা পেট্রা প্রিবোরস্কার ছবি ‘এনা’।

ছোট এবং মুক্ত চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে স্পেশাল মেনশন শর্ট ফিকশন এ সেরা নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের খন্দকার সুমনের ‘পৌণঃপুণিক’, সেরা ছোট ফিকশন নির্বাচিত হয়েছে ইরাকের নির্মাতা বাকার আল রবাইয়ের চলচ্চিত্র ‘ভায়োলেট’, স্পেশাল মেনশন শর্ট  ডকুমেন্টারি নির্বাচিত হয়েছে নেপালের নির্মাতা প্রদীপ পোখরেল এর চলচ্চিত্র ‘আ সং ফর বারপাক’। সেরা ছোট প্রামাণ্যচলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে যুক্তরাজ্যের নির্মাত পিয়েত্রো নভেলোর ‘কন্টিনেন্টাল ড্রিফট’

ফিপ্রেসি বাংলাদেশ প্যানারোমা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে লতা আহমেদ এর পরিচালনায় ৯২ মিনিটের ‘সোহাগীর গয়না’। এটি তার প্রথম নির্মাণ। আবেগী কণ্ঠে তিনি বাংলায় বলেন, ‘আমি মরে যাওয়ার পর পুরস্কার পেলাম না বেঁচে থেকে পেলাম তা ভাবছি।’

এ ক্যাটাগরিতে সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতে বাজিমাত করেছেন ‘হালদা’ ছবির নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। পুরস্কার পেয়ে তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘এ পুরস্কার বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্ব দরবারে ভিন্ন আলোকে পরিচিত করবে। যা আগামীর নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।’

উৎসবের এ ক্যাটাগরিতে ১০টি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়।

সবশেষে আকাঙ্খিত উৎসবের এশিয়ার সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচনের প্রতিযোগিতা বিভাগের ঘোষণা আসে। তুরস্কের কাজিম ও’জর এর চলচ্চিত্র ‘জার’ সেরা চলচ্চিত্র  নির্বাচিত হয়। ১৯৩৮ সালের দারসিম হত্যঅকান্ডের পেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। এ বিভাগে সেরা নির্মাতা নির্বাচিত হন তুরস্কের নির্মাতা অনুর শায়লাক। ‘দাহা (মোর)’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। এ বিভাগে সেরা অভিনেতা হয়েছেন ফিলিপাইনের অভিনেতা অ্যালেন ডিজান। রাস্টলেন গঞ্জালেস এর পরিচালনায় ‘বোম্বা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য। সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন ইরানের দুজন। পারিনাজ ইজদায়ের এবং মিনা সাদাতি ইরানের চলচ্চিত্র ‘তাবেস্তান-ই-দাগ’ এ অভিনয়ের জন্য এ পুরস্কার জেতেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, প্রতি বছর উৎসবের কলেবর বড় হচ্ছে। তার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে।’ তিনি আরো বলেন, চলচ্চিত্র তার শক্তিশালী ভাষার মাধ্যমে সীমানার গন্ডিকে বাঁধতে পারে হৃদ্যতার বন্ধনে। নির্দিষ্ট ভাষা তখন কোন বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনা চিন্তার আদানপ্রদাণে।’ তিনি আরো বলেন, আগামীর বিশ্বকে যান্ত্রিকতার নির্মমতা থেকে আবেগের আঁচলে টেনে নিতে পারে কেবল চলচ্চিত্র।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য মন্ত্রনালয়ের সচিব  নাসিরউদ্দিন আহমেদ, সচিব তথ্য মন্ত্রন্ত্রনালয়, ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত ভিসেন্তো ভিভেন্সিও টি ব্যান্ডেলিও।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কিশওয়ার কামাল।  সমাপনি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতাবা জামাল এবং ফাতিমা আমিন।

‘বন্ধু তুমি ভরা নদীর জোয়ার ভাটা না/ ক্ষণে ক্ষণে ঢেউ আসে বন্ধু তুমি আসোনা।’ আবারো ১ বছরের অপেক্ষা। ১৭ তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য। এতটুকু অপেক্ষা তো করতেই হবে। অপেক্ষা ছাড়া ভালো কোন কিছু মিলেছে কোন কালে।

ছবি: সাকিব উল ইসলাম

উৎসবতৌকীর আহমেদ