আইসিসি আদৌ কিছু ভাবছে?

আইন সবার জন্য সমান। বাংলাদেশের জন্যও ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু এই স্বাভাবিক আইনটি নিয়েই এখন প্রশ্ন উচ্চকিত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩ রানে হারের পর ‘৪ রান বঞ্চিতের’ স্বাভাবিক আইন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পুনর্বার। ধারাভাষ্যকার থেকে বিশ্লেষক, বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি তুললেও ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার থেকে কোনো উদ্যোগের খবর মেলেনি এখন অবধি।

কখন ঘটেছিল?
গায়ানায় বুধবার দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ইনিংসের ৪৩তম ওভারের তৃতীয় বলের সময় ঘটে প্রশ্নের মুখে পড়া ঘটনাটি।

কি ঘটেছিল?
উইকেটে তখন জমে গেছেন মুশফিক। রান তাড়ায় সুবিধাজনক স্থানে বাংলাদেশ। আবার রানের গতিও বাড়ানো দরকার। মুশফিক সেই চেষ্টাই করছিলেন। স্পিনার দেবেন্দ্র বিশুর করা ওই বলটি রিভার্স সুইপ করেছিলেন টাইগার তারকা। ঠিকঠাক ব্যাটে-বলে না হওয়া বলটিই উইকেটরক্ষকের পাশ গলে বাউন্ডারি সীমানা পেরিয়ে যায়। বিশুসহ স্বাগতিক ফিল্ডাররা এলবিডব্লিউয়ের জোরাল আবেদন করেন। মাঠ আম্পায়ার আঙুলও তুলে দেন। মনোপুত না হওয়ায় সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ নেন মুশফিক। টিভি রিপ্লেতে আলট্রা এজে ধরা পড়ে বলটা মুশির ব্যাটে চুমু দিয়ে গেছে। আউটের হাত থেকে বেঁচে যান। চার হওয়া সেই বলে মুশফিক ও বাংলাদেশের নামের পাশে কোনো রানও যোগ হয়নি।

আইন কি বলছে?
আইসিসির বাইলজে ২৩নং ধারার প্রথম অধ্যায়ের তিন নম্বর উপ-ধারায় বলা আছে, আম্পায়ার কোনো ব্যাটসম্যানকে আউট দেয়ার সঙ্গেই বলটি ‘ডেড’ বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, ব্যাটসম্যানের নামের সঙ্গে ওই ডেলিভারির কোনো রান যোগ হবে না। মুশফিকের ক্ষেত্রে এই আইনটিই প্রয়োগ হয়েছে। যেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশও নেই। বাংলাদেশ ম্যাচে বা পরে তোলেনি কোনো প্রশ্নও।

কোন যুক্তিতে আইন?
স্বাভাবিক এই আইনটিই রিভিউয়ের ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণ করে! রিভিউ সময়ের আইসিসি আইনও ‘আউট আইনের’ পথেই চলছে। যাতে, মাঠ আম্পায়ার আউট দেয়ার পর স্বাভাবিক আউটের মতো করে ওই বলে কোনো রান হয় না। আম্পায়ার আউট দেয়ার পরপরই যখন কোনো বল ‘ডেড’ বিবেচিত হয়, রিভিউ সময়ের আউটের ক্ষেত্রেও একই বিষয়ই বিবেচিত হচ্ছে।

যুক্তিও একই, আম্পায়ার একবার কাউকে আউট দিলে প্রতিপক্ষ ফিল্ডাররা সাধারণত বল ধরার দিকে মনোযোগ দেন না। সেই সুযোগে কোনো রান নিয়ে থাকলে তা ব্যাটসম্যানের নামের পাশে যুক্ত হয় না। কিন্তু রিভিউ উল্টে গেলে তো ব্যাটসম্যান আউট নন, তখন? রিভিউয়ে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত উল্টে গেলে কী হবে সেটিই যে আইনে স্পষ্ট করা নেই! গোলটা বাঁধছে সেখানেই। মুশফিক মাঠ আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আউট ছিলেন। পরে রিভিউ নিয়ে বেঁচে গেলেও বাউন্ডারি হওয়া ওই ৪ রান আর যোগ হয়নি তার ও বাংলাদেশের সংগ্রহে।

বিশেষজ্ঞরা কি বলছেন?
ম্যাচ শেষে আলোচনায় থাকা দুই টিভি ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ ও জেফ ডুজন প্রসঙ্গটি টেনেছেন। দুই ক্যারিবীয় সাবেক আইনটিকে ‘বিতর্কিত’ উল্লেখ করে আইসিসিকে পুনর্বার ভেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। সঙ্গে সতর্ক করেছেন, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে বা তার ফাইনালে ম্যাচের শেষ বলে যদি এমনকিছু ঘটে, যদি শিরোপা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে বিষয়টি, তখন সেটি হবে দুঃখজনক ও মহাবিতর্কিত।

ক্রিকেট পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে খ্যাত রজনীষ গুপ্তও টুইট করেছেন মুশফিকের ঘটনাটি নিয়ে। লিখেছেন, আম্পায়ার আউট দেয়ার জন্য মুশফিকুর রহিমের না পাওয়া ওই ৪ রান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ডিআরএসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পাল্টানো হয়েছে। কিন্তু মুশফিক বাউন্ডারিটা আর পাননি। আইনের এই প্যাঁচ একদিন বিতর্ক তুলবে।

আইসিসি কিছু ভাবছে?
আইনটির জন্ম হওয়ার পর থেকেই কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। আম্পায়ারের ভুলের খেসারত কেনো সংশ্লিষ্ট ব্যাটসম্যান ও তার দলকে দিতে হবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উচ্চকিত হয়েছে। রিভিউ আইনের গলদ হিসেবে চিহ্নিত বিষয়টিকে নিয়ে ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থার টনক অবশ্য নড়েনি। তারা কখনও বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কথাও বলেনি। মুশফিকের ঘটনার পর যখন আরেকবার বিশ্বক্রিকেটে ‘রিভিউয়ের গলদ’ আইন আলোচনায়, আইসিসির পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি আসেনি।

প্রথম কখন নজরে আসে?
সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার ওয়ানডে সিরিজ চলছিল ক্যান্ডিতে। চার বছর আগের ওই সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ঘটে অদ্ভুত গলদের একই ঘটনা। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে লঙ্কান ব্যাটসম্যান মাহেলা জয়াবর্ধনে, মাহেলার প্যাডে লেগে বল বাউন্ডারি হয়। প্রোটিয়া ফিল্ডারদের এলবির আবেদনে সেসময় আঙুলও তুলে দেন আম্পায়ার। চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ নিয়ে সিদ্ধান্তের উল্টো ফল পান লঙ্কান তারকা। বেঁচে যান, কিন্তু লেগবাই থেকে আসা ওই ৪ রান আর শ্রীলঙ্কার সংগ্রহে যোগ হয়নি। শ্রীলঙ্কা অবশ্য সেই ম্যাচটি জিতেছিল। এবার বাংলাদেশ জিততে পারেনি। মাত্র ৩ রানের জন্য।

আফসোসে নতুন মাত্রা!
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাই আসল। বাংলাদেশ শেষ ওভারে ৬ উইকেট হাতে রেখেও ৮ রানের সমীকরণ মেলাতে পারেনি। ৩ রানে হেরেছে। ব্যাটসম্যানদের শেষের ব্যর্থতাই সবার আগে আলোচনায় আসবে। কিন্তু হারের রানটা যখন কেবল ৩, তখন ব্যর্থতার পিঠে আফসোসটাও উচ্চকিত হচ্ছে- ওই ৪টা রান! তাতেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে আইসিসির বিতর্কিত আইনটি!

আইসিসিবাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজস্পোর্টস বিশেষ