বিরল হলেও এয়ার টার্বুলেন্স এখন আর শুধু বিরক্তির বিষয় নয়, ক্রমেই হয়ে উঠছে নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতি বদলে যাচ্ছে, যার ফলে বাড়ছে যাত্রা পথে উড়োজাহাজে হঠাৎ ঝাকুনি বা এয়ার টার্বুলেন্সের ঘটনা।
আজ (৩০ জুলাই) বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২০০-এর বেশি গুরুতর হতাহতের ঘটনা ঘটেছে টার্বুলেন্সের কারণে। জাতীয় পরিবহন সুরক্ষা বোর্ডের মত, ২০২৩ সালে উড়োজাহাজের যাত্রীদের গুরুতর আঘাতের ৪০ শতাংশ ঘটেছে এই কারণে।
নিউজিল্যান্ডে একটি প্রদর্শনীতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন অ্যান্ড্রু ডেভিস। ফ্লাইটে প্রথম অংশ ছিল মসৃণ। কিন্তু এরপরই শুরু হয় এয়ার টার্বুলেন্সের দুঃস্বপ্ন। অ্যান্ড্রু বলেন, রোলারকোস্টারে ওঠা ছাড়া আর কোনও উপমা মাথায় আসে না। হঠাৎই ভয়াবহভাবে কেঁপে ওঠে উড়োজাহাজটি।
মাথায় পড়ে তার আইপ্যাড, কাপড় ভিজে যায় ছিটকে পড়া কফিতে। কেবিনে তখন চারদিকে আতঙ্ক, আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। ঘটনার ভয়াবহতায় ৭৩ বছর বয়সী জিওফ কিচেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আহত হন আরও অনেকে।
গত ৪০ বছরে উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে এরকম ঘটনা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। তবে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও কিছু অঞ্চলেও ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, জেট স্ট্রিমের (উচ্চগতির বায়ুপ্রবাহ) গতি ও কাঠামোয় পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফলে মাঝ আকাশে বাতাসের ওঠানামা হয়ে উঠছে আরও অপ্রত্যাশিত এবং বিপজ্জনক।
অ্যান্ড্রু ডেভিস যে ফ্লাইটে ছিলেন, সেটি দক্ষিণ মায়ানমারের ওপর দিয়ে উড়ার সময় ১৯ সেকেন্ডের টার্বুলেন্সের মধ্যে পড়ে। মাত্র ৫ সেকেন্ডেই উড়োজাহাজটি ১৭৮ ফুট নিচে নেমে আসে বলে জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের তদন্ত ব্যুরো।
প্রযুক্তির প্রতিকার
উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো ঝড়-বাদলের পূর্বাভাস পেতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সংস্থা এখন ১৮ হাজার ফুট উচ্চতার আগে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপদে বসে থাকতে উৎসাহিত করতে কেবিন পরিষেবা বন্ধ করে দিচ্ছে। কোরিয়ান এয়ার তাদের ইকোনমি ক্লাসে নুডলস পরিবেশন বন্ধ করেছে, কারণ গরম তরলে দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
অন্যান্য ক্ষেত্রে, গবেষকরা ডানার অনুকরণে নতুন ধরনের নমনীয় ডানা তৈরি নিয়ে গবেষণা করছেন, যা দমকা বাতাসে স্থিতিশীলতা আনতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি এআই প্রযুক্তি ফ্যালকনের উন্নয়ন চলছে, যা রিয়েল-টাইমে পাখার গতিবিধি বুঝে তা সামঞ্জস্য করতে পারে।
প্রতি বছর একটি উড়োজাহাজ সংস্থার টার্বুলেন্সের কারণে ক্ষতি হতে পারে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত। এয়ার ট্রাফিক ডাইভারশন, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার, যাত্রী ক্ষতিপূরণ—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে আর্থিক খাতে।

ইউরোকন্ট্রোলের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে খারাপ আবহাওয়ার কারণে উড়োজাহাজগুলো ১০ লাখ অতিরিক্ত কিলোমিটার উড়েছে, যার ফলে উৎপন্ন হয়েছে ১৯ হাজার টন অতিরিক্ত কার্বন।
যাত্রীরা কতটা নিরাপদ
উড়োজাহাজ নির্মাণে এখন এমনভাবেই ডানাগুলো তৈরি হয়, যাতে তা ভয়াবহ টার্বুলেন্সও সামাল দিতে পারে। বোয়িং ৭৪৭-এর ডানা পরীক্ষামূলকভাবে ২৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকানো হলেও ভাঙে না। তবুও, যাত্রীদের জন্য সতর্কতা জরুরি। বিমানবন্দরে উঠেই সিটবেল্ট বাঁধা, অস্থিরতা শুরু হলে দ্রুত বসে পড়া—এই অভ্যাসগুলোই জীবন বাঁচাতে পারে।
রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ অধ্যাপক পল উইলিয়ামস বলেন, আগে আমি যেভাবে উড়তাম, এখন আর পারি না। কিন্তু এটাকে নিজের জীবন থামিয়ে দিতে দেব না।









