রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম বহু বছর ধরে রূপালী পর্দায় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে এসেছে। তাঁর সাহিত্য উত্তরাধিকার যেমন বিশাল, তেমনি সেটি চলচ্চিত্রের জগতে গভীর প্রভাবও ফেলেছে— বিশেষত সত্যজিৎ রায়ের মতো কিংবদন্তি নির্মাতাদের উপর। যদিও কাবুলিওয়ালা তাঁর রচনার মধ্যে সবচেয়ে বহুল পরিচিত চলচ্চিত্র রূপ, বিশেষ করে অ-বাঙালি দর্শকদের কাছে, কিন্তু এর বাইরেও রবীন্দ্র-রচনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত বহু চলচ্চিত্র রয়েছে যা অনন্য ও অবিস্মরণীয়।
৬ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নিচে তুলে ধরা হলো এমন কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র, যেগুলি তাঁর সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে নির্মিত—
কাবুলিওয়ালা (১৯৫৭, ১৯৬১)
আফগান কিশমিশ-বাদাম বিক্রেতা রহমত ও এক বাঙালি শিশুর মধ্যে গড়ে ওঠা মমতার সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই ছোটগল্প যুগ যুগ ধরে পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তপন সিনহার পরিচালনায় ছবি বিশ্বাস অভিনীত ১৯৫৭ সালের বাংলা চলচ্চিত্রটি ছিল এক বিশাল সাফল্য। পরে ১৯৬১ সালে বিমল রায় এর হিন্দি রূপান্তর করেন, যেখানে রহমতের চরিত্রে অভিনয় করেন বলরাজ সাহনি। দুটি চলচ্চিত্রই তাদের আবেগপ্রবণ গল্প ও শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য স্মরণীয়। একই গল্পে আরো বহু চলচ্চিত্র পরে নির্মিত হয়েছে।
চারুলতা (১৯৬৪)
সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা রবীন্দ্রনাথের “নষ্টনীড়” গল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, এবং এটি সম্ভবত সবচেয়ে প্রশংসিত রূপান্তর। এক নিঃসঙ্গ, বুদ্ধিদীপ্ত গৃহবধূর মনোজগৎ ও প্রেমানুভূতি নিয়ে সত্যজিৎ এমন এক সিনেমা তৈরি করেন যা তাঁর নিজের শিল্পিত ভাষা ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকল্প—উভয়ের নিখুঁত মেলবন্ধন। মাধবী মুখার্জীর অপেরা গ্লাস দিয়ে বাইরের জগৎ দেখা— এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্র ইতিহাসে অমর।
অন্তরীন (১৯৯৩)
রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের অন্যতম চমৎকার রূপ হলো তপন সিনহার এই ছবি। যদিও গুলজার পরিচালিত হিন্দি চলচ্চিত্র লেকিন (১৯৯০) গল্পটিকে আধুনিকভাবে রূপ দেন এবং পুনর্জন্মের বিষয়টি জুড়ে দেন।
চার অধ্যায় (১৯৯৭)
রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাস ‘চার অধ্যায়’ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আদর্শবাদ নিয়ে লেখা। কুমার শাহানির এই চলচ্চিত্রটি ছিল অত্যন্ত পরীক্ষামূলক— যেখানে ডকুমেন্টারি ফুটেজের ব্যবহার, জটিল সংলাপ, এবং কেকে মহাজনের মনকাড়া সিনেমাটোগ্রাফি সিনেমাটিকে বিশেষ করে তোলে।
চতুরঙ্গ (২০০৮)
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস চতুরঙ্গ প্রেম, বিশ্বাস, আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব নিয়ে তৈরি। সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি সাহসের সঙ্গে চরিত্রগুলির মধ্যেকার টানাপড়েন ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক তুলে ধরেছে।
নৌকাডুবি (২০১১)
নৌকাডুবি— ১৯০৬ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস। একটি নৌকাডুবির ঘটনায় দুই নববধূর বদলি হওয়া নিয়ে লেখা। বহুবার রূপান্তরিত এই কাহিনির অন্যতম সেরা আধুনিক রূপ হলো ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় নির্মিত সংস্করণ। এতে অভিনয় করেছেন রাইমা সেন ও রিয়া সেন— যারা কিংবদন্তি সুচিত্রা সেনের নাতনি।
চিত্রাঙ্গদা (২০১২)
মহাভারতের কাহিনির আধারে রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা নাট্যরূপে রচিত। মণিপুরের এক রাজকন্যা, যাকে রাজপুত্ররূপে বড় করা হয়, সে অর্জুনকে দেখে নারীত্বকে ফিরে পেতে চায়। ঋতুপর্ণ ঘোষ এই আখ্যানে সমকামী পরিচয়, লিঙ্গ পরিচয়ের তরলতা, জেন্ডার অ্যাফারমেশন সার্জারি এবং সমলিঙ্গ দত্তক ইত্যাদি সামাজিক ইস্যু যুক্ত করে এক সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। – টাইমস নাউ









