টেলিভিশনে গতানুগতিক ধারার কাজের বাইরে হুমায়ূন আহমেদের পর যে মানুষটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি ফারুকী। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বাংলা টিভি ফিকশন ও চলচ্চিত্রে একটি বিপ্লবের নাম। শুধু টিভি দর্শকের কাছে নয়, চলচ্চিত্রেও একের পর এক সেই সাক্ষর রেখে যাচ্ছেন তিনি। টিভি ফিকশন ও চলচ্চিত্র নির্মাণের এই কারিগর ২মে পা রাখলেন ৫০ বছরে।
ধারাবাহিক ও একক নাটকে ফারুকীর ক্যারিশমায় মুগ্ধ প্রজন্ম। ৫১বর্তী থেকে ফোর টুয়েন্টি- ঊনমানুষ, স্পার্টাকাস ৭১, এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি, ওয়েটিং রুম, পারাপার এবং আয়েশাসহ অগনিত টিভি ফিকশনের নাম বলা যাবে! সিনেমাতেও স্বতন্ত্র ছাপ ফেলেছেন এই নির্মাতা। লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান দিয়ে ওটিটিতেও নিজের সক্ষমতার কথা জানান দিয়েছেন ভালো করেই।
বিভিন্ন সময় সমালোচকের দৃষ্টিতে ফারুকীর টিভি, সিনেমা এবং ওটিটির কাজগুলোর মধ্যে আলোচিত ৫টি কাজের কথা থাকলো এখানে:
আয়েশা
চ্যানেল আইয়ের জন্য নির্মিত নন্দিত নির্মাতা ফারুকীর অন্যতম সেরা কাজ ‘আয়েশা’। সম্প্রচারের সময় সমালোচকরা এটিকে সময়ের সাহসী নির্মাণ বলেও মন্তব্য করেছেন। ফারুকীর জীবনের সেরা কাজগুলোর অধিকাংশের পেছনে রয়েছেন সাহিত্যিক আনিসুল হক। আয়েশা টিভি ফিকশনটিও আনিসুল হকের ‘আয়েশামঙ্গল’ উপন্যাসের ভিজ্যুয়ালাইজেশন। নাটকটি সত্তরের দশকের এক অস্থির সময়ের গল্প। এর শুরুটা খুবই সাদামাটা। বিমানবাহিনীর কর্পোরাল জয়নাল (চঞ্চল চৌধুরী) এবং তার স্ত্রী আয়েশা (তিশা) নতুন সংসার শুরু করে। ছোট ছোট খুনসুঁটির মধ্য দিয়েই তাদের মধ্যকার সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। আয়েশার ভাষায়, তাদের শেকড়ের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি হতে থাকে, যার অন্য নাম ভালোবাসা। কিন্তু এর মধ্যেই একদিন এক ঝড়ের মতো সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। জাসদের অনুপ্রবেশকারীরা আক্রমণ করে বসে ক্যান্টনমেন্টে এবং এয়ারপোর্টে। চিফের সাথে অবস্থান করা জয়নাল চিফের জীবন রক্ষা করে, কিন্তু তারপরেও ভুল বোঝাবুঝির ফলে সে পড়ে যায় সন্দেভাজনদের তালিকায়। তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মুখ থেকে এমন তথ্য বের করার জন্য শুরু হয় তার উপর চরম নির্যাতন, যে তথ্য তার জানা নেই।
ইতিহাসের ভুলে যাওয়া এক অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসার পাশাপাশি নির্মাণেও যে দারুণ যত্নের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে, সে কারণে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় ‘আয়েশা’। মূখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। বলা হয়, এটি তিশার ক্যারিয়ারেও অন্যতম কাজ হয়ে থাকবে।
সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি
ওটিটির জন্য নির্মিত হলেও সিনেমাটি বুসানসহ বেশকিছু চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শীত হয়েছে। কুড়িয়েছে প্রশংসা। এই ছবির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো অভিনেতা হিসেবে হাজির হলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন স্ত্রী ও গুণী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা! সাম্প্রতিক ফারুকীর সিনেমাগুলোর মধ্যে দর্শকের পাশাপাশি সমালোচকরাও সিনেমাটি পছন্দ করেছেন। নির্মাণেও এটিকে সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া এই নির্মাতার ‘মনোগামী’র চেয়ে এগিয়ে রাখছেন অনেকে। সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয়াদি যে দুর্দান্তভাবে তিনি এই সিনেমায় ডিল করেছেন, তারও প্রশংসা করেছেন অনেকে।
টেলিভিশন
২০১৩ সালে বড়পর্দার আলোচিত ছবি টেলিভিশন। ফারুকী পরিচালিত চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিলো এটি। নির্মাতার সাথে যৌথভাবে এই ছবিরও কাহিনী লিখেছেন আনিসুল হক। ছবিতে প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী ও নুসরাত ইমরোজ তিশা। চলচ্চিত্রটি নির্মাণাধীন থাকা কালে গুটেনবর্গ ফিল্ম ফেস্টিভালে চিত্রনাট্যের জন্য পুরস্কার লাভ করে এবং মুক্তির আগেই জিতে নেয় ২০১২ সালের এশিয়ান সিনেমা ফান্ড ফর পোস্ট প্রোডাকশন পুরস্কার। এছাড়াও ৮৬তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার) এর বিদেশি ভাষার সিনেমা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য চলচ্চিত্রটিকে বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এছাড়াও ১৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও ‘এশিয়ান সিলেক্ট’ ক্যাটাগরিতে সেরা সিনেমা হিসেবে ‘নেটপ্যাক পুরস্কার’ পায় এটি। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০১৩ এশিয়া-প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডে (অ্যাপসা) ফার্স্ট জুরি গ্র্যান্ড পুরস্কার অর্জন করে চলচ্চিত্রটি। সিনেমাটিকে ফারুকীর অন্যতম সেরা সিনেমা বলেও মনে করেন কেউ কেউ।
ডুব
নানাকারণেই বহুল আলোচিত ছবি ‘ডুব’। এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার কোনো বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন প্রয়াত গুণী বলিউড অভিনেতা ইরফান খান। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয় সিনেমাটি। যদিও নির্মাতা এটিকে পুরোপুরি ফিকশনাল চরিত্র বলে মন্তব্য করেছেন। লেখক জাভেদ হোসেনের জীবনের মধ্যাহ্নের সঙ্কটে তিনি তার মেয়ে সাবেরির বাল্যবন্ধু নিতুর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। যা তার পরিবারে ভাঙ্গনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিনেমায় সাবেরি চরিত্রে নুসরাত ইমরোজ তিশা, নিতু চরিত্রে পার্নো মিত্র এবং মায়া চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী অভিনয় করেছেন। জাজ মাল্টিমিডিয়া, এসকে মুভিজ এবং ইরফান খান যৌথভাবে এই সিনেমা প্রযোজনা করেন। অস্কারের ৯১তম আসরে বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করেছে ‘ডুব’।
ব্যাচেলর
এই ছবির মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে পা রাখেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এটি মুক্তি পায় ২০০৪ সালে। এর কাহিনী রচনা করেছেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক আনিসুল হক। ছবিটি প্রযোজনা করে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। ব্যাপক প্রশংসিত এ ছবিতে অভিনয় করেন ফেরদৌস, শাবনূর, অপি করিম, হুমায়ুন ফরীদি, মারজুক রাসেল, আহমেদ রুবেল, আরমান পারভেজ মুরাদ, জয়া আহসানসহ আরও অনেকে। এই ছবিতে অভিনয় করেই ২০০৪ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান অপি করিম।









