জুলাই আগস্টে সংঘটিত গনহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব সহ ৪৬ জনের বিষয়ে আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য প্রসিকিউসনের সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের এই দিন ধার্য করেন।
এসময় চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্র্যাইব্যুনালকে বলেন, এই মামলায় তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। যদিও আমরা দুই মাস সময় চেয়েছি। তবে আশাকরি আগামী মাসের মধ্যেই আমরা এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পেয়ে যাবো।’ একপর্যায়ে ট্র্যাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটরের উদ্দেশ্য বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য সময় নেন সমস্যা নেই, আমরা সময় দেব। তবে তদন্ত প্রতিবেদন যেন ত্রুটিপূর্ণ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
ট্রাইব্যুনালে আজ প্রসিকিউসন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম শুনানি করেন। শুনানিতে অপর প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, আসামী পক্ষে আইনজীবী জেড আই খান পান্না সহ অন্যান্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, জুলাই আগস্টে সংঘটিত গনহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক মামলায় গ্রেফতার আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিসহ ১৬ জন আজকের শুনানির সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন।
গত ১৭ ডিসেম্বর দেয়া আদেশে অনুযায়ী যে ১৬ জনকে মঙ্গলবার সকাল ১০ টার পর ট্রাইব্যুনালে আনা হয় তারা হলেন: সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী আনিসুল হক, ফারুক খান, দীপু মনি, আব্দুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, কামাল আহমেদ মজুমদার, গোলাম দস্তগীর গাজী, আমির হোসেন আমু, কামরুল ইসলাম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী, সালমান এফ রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম।
গত ৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগের মামলায় গত ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এবং আরেক মামলায় তার পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়াও তার বোন শেখ রেহানা, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই সাবেক এমপি শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তার দুই ভাতিজা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ রয়েছেন। এছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের বিরুদ্ধে।
গত ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানেই আছেন শেখ হাসিনা। তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশই এখন রয়েছেন আত্মগোপনে।
এদিকে, জুলাই আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে ‘গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটনের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি, হত্যার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। জুলাই আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। এরপর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার শুরু হয়। এখন পর্যন্ত প্রসিকিউটসন ও তদন্ত সংস্থায় জুলাই আগস্টের গনহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।









