বগুড়া কারাগারে কনডেম সেলে থাকা ২৬ কয়েদীকে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কক্ষে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ১০ জন এবং বাকি ১৬ জন জঙ্গী ও দুর্ধর্ষ কয়েদি। নিরাপত্তারা স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে শুক্রবার (২৮ জুন) বিকেলে কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল শেখ সুজাউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বগুড়া কারাগারে ৫টি কনডেম সেল রয়েছে। এসব সেলের মধ্যে আত্রাই সেলে জঙ্গি ও দুর্ধর্ষ ১৬ কয়েদি ছিল। এছাড়া বাকি ১৩ জন ছিল অন্য সেলে। এদের মধ্যে গতকাল তিনজন ফাঁসির কয়েদিকে রাজশাহী কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। আর শুক্রবারে বাকি ১০জন ফাঁসির এবং জঙ্গিসহ ১৬জন কয়েদিকে কারাগারের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কক্ষে স্থানান্তর করা হয়েছে। এটা মূলত নিরাপত্তার স্বার্থেই করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যে কারাগার থেকে চারজন ফাঁসির কয়েদি পলায়নের ঘটনায় মামলা এবং তদন্ত চলমান তাই ওই কয়েদীদের ডান্ডাবেরি পরিয়ে অন্য কক্ষে রাখা হয়েছে। তবে তদন্ত ও মামলার কাজ শেষ হলে তাদেরকেও অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হবে।
দায়িত্বে অবহেলার বিষয় উঠে আসায় বগুড়া কারাগারের ডেপুটি জেলার হোসেনুজ্জামান, প্রধান কারারক্ষী আব্দুল মতিনসহ ৫ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরও তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে।
এর আগে, গত বুধবার বগুড়া জেলা কারাগারের কনডেম সেলের ছাদ ফুটো করে বিছানার চাদরকে রশি হিসেবে ব্যবহার করে পালিয়ে যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি। তারা হলেন- কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দিয়াডাঙ্গা এলাকার নজরুল ইসলাম ওরফে মজনু (কয়েদি নম্বর-৯৯৮), নরসিংদীর মাধবদী উপজেলার ফজরকান্দি এলাকার আমির হোসেন (কয়েদি নম্বর-৫১০৫), বগুড়ার কাহালু পৌরসভার মেয়র আবদুল মান্নানের ছেলে মো. জাকারিয়া (কয়েদি নম্বর-৩৬৮৫) এবং বগুড়ার কুটুরবাড়ি পশ্চিমপাড়া এলাকার ফরিদ শেখ (কয়েদি নম্বর-৪২৫২)।
এই চার কয়েদি একই সেলে থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে মঙ্গলবার (২৫ জুন) রাতে তারা কনডেম সেলের ছাদ কেটে কাপড়ের রশি বানিয়ে ছাদ থেকে নেমে পালিয়ে যায়। পরে বুধবার (২৬ জুন) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জেলখানার অদূরে একটি বাজার থেকে স্থানীয়রা তাদের আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। জেল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে বিষয়টি জানায় ৩টা ৫৬ মিনিটে। এরপর পুলিশের সব ফাঁড়ি এবং টহল দলকে অ্যালার্ট করে দেয়া হয়। একপর্যায়ে ভোর সাড়ে ৪টায় সদর ফাঁড়ির সব-ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে পলাতক চার আসামিকে ধরে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে কারা কর্তৃপক্ষ যেয়ে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেন। পরে মামলা দায়েরের পর আদালতের মাধ্যমে আবারও তাদের কারাগারে পাঠানো হয়৷
ওই ঘটনার দিন সকালেই জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, ডিআইজি প্রিজনসহ একাধিক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। এর পাশাপাশি কারা কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন৷
কয়েদি পালানোর ঘটনায় কারা অধিদফতর গঠিত তদন্ত কমিটি বুধবার থেকেই কাজ শুরু করেছে। কমিটির প্রধান অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল শেখ সুজাউর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি জেলা কারাগারে তদন্ত কাজ চালিয়েছে। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিও বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে কাজ শুরু করেছে।
তদন্তের ব্যাপারে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল সুজাউর রহমান বলেন, আমরা চার কয়েদির সঙ্গে কথা বলেছি। কীভাবে ঘটনা ঘটল, সেটি তদন্ত করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত বা প্রশাসনিক কোনো দুর্বলতা ছিল কি না কিংবা কর্তব্যে অবহেলা ছিল কি না, সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিউটি রোস্টার ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেগুলোও তদন্তের অধীন থাকবে। সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত শেষে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইমরুল কায়েস বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে তদন্ত শুরু করেছি। নিরাপত্তা, দায়িত্বে অবহেলাসহ এর সঙ্গে অন্য কোনো পক্ষের যোগাযোগ রয়েছে কি না, সবগুলো বিষয়ই তদন্তে উঠে আসবে।
অন্যদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুজন মিয়া বলেন, চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছি। আদালত রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করলে সে অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে আসামিদের।









