আগামী শনিবার (১০ জানুয়ারি) পর্দা উঠছে চতুর্বিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। ‘নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ’—এই স্লোগান সামনে রেখে রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে এবারের উৎসব। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯১টি দেশের মোট ২৪৫টি পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে।
বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উৎসবের বিস্তারিত কর্মসূচি ও আয়োজন সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল।
প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর বিভাগসমূহ
এশিয়ান ফিল্ম কম্পিটিশন
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাছাইকৃত চলচ্চিত্র নিয়ে গঠিত এই প্রতিযোগিতা বিভাগে স্বাধীন আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের মাধ্যমে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচন করা হবে। বিজয়ী চলচ্চিত্র পাবে ক্রেস্ট, সনদ ও নগদ অর্থ পুরস্কার। পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, চিত্রগ্রাহক ও চিত্রনাট্যকারের জন্য আলাদা পুরস্কার থাকছে।
রেট্রোস্পেকটিভ বিভাগ
এই বিভাগে বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের নির্বাচিত চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে, যা দর্শকদের চলচ্চিত্র ইতিহাস ও শিল্পমূল্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবে।
বাংলাদেশ প্যানোরামা
বাংলাদেশের নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বিভাগ। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক সংস্থা ফিপ্রেসি বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে এখানে সেরা চলচ্চিত্রকে সমালোচক পুরস্কার দেওয়া হবে।
ওয়াইড অ্যাঙ্গেল
এবারের উৎসবে এই বিভাগে বিভিন্ন দেশের সমসাময়িক ও বিষয়ভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে। বিশেষ জুরি দ্বারা নির্বাচিত চলচ্চিত্রগুলো আলাদা স্বীকৃতি পাবে।
সিনেমা অফ দ্য ওয়ার্ল্ড
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমকালীন চলচ্চিত্র নিয়ে সাজানো এই বিভাগে আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে বৈচিত্র্যময় গল্প ও ভাষার সিনেমা।
চিলড্রেন ফিল্ম সেশন
শিশুদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে থাকছে বিশেষ এই বিভাগ। সব শিশুর জন্য উন্মুক্ত এই প্রদর্শনী থেকে একটি চলচ্চিত্র ‘বেস্ট জুভেনাইল অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য মনোনীত হবে।
স্পিরিচুয়াল ফিল্মস
ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবতাবাদ ও আন্তঃধর্মীয় মেলবন্ধনের গল্প নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো এই বিভাগে প্রদর্শিত হবে। ইন্টারফেইথ জুরি সেরা কাহিনিচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্বাচন করবে।
উইমেন ফিল্মমেকার সেকশন
দেশি-বিদেশি নারী নির্মাতাদের পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে এই বিভাগ সাজানো হয়েছে। সেরা নারী নির্মাতাসহ একাধিক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হবে।
শর্ট অ্যান্ড ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্মস
নবীন ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের জন্য এই বিভাগটি বরাবরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।
ওপেন থিয়েটার বায়োস্কোপ
এবারই প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের লাবণী বিচ পয়েন্টে ওপেন এয়ার স্ক্রিনিং অনুষ্ঠিত হবে, যা সকল দর্শকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর স্থান
জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তন ও কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ও নাট্যশালার মূল মিলনায়তন, অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ ঢাকা এবং স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মিলনায়তনে চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হবে। সব প্রদর্শনীই বিনামূল্যে উপভোগ করা যাবে। আসন সংখ্যা সীমিত থাকায় ‘আগে এলে আগে দেখবেন’ ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হবে।
সেমিনার, কনফারেন্স ও মাস্টারক্লাস
১১ ও ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ‘টুয়েলফথ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন উইমেন ইন সিনেমা ২০২৬’। এই কনফারেন্সে দেশ-বিদেশের নারী নির্মাতারা চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা, প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করবেন।প্রধান অতিথি হিসেবে ১১ জানুয়ারি কনফারেন্সটি উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর তানিয়া হক। অধ্যাপক কিশোয়ার কামালের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানটি শুরু হবে সকাল সাড়ে ৯টায়, একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
এছাড়া ১১–১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ওয়েস্ট মিটস ইস্ট স্ক্রিনপ্লে ল্যাব, যেখানে নির্বাচিত এশিয়ান নির্মাতারা আন্তর্জাতিক মেন্টরদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবেন। সেরা চিত্রনাট্যের জন্য থাকছে নগদ অর্থ পুরস্কার।
১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে মাস্টার ক্লাস। দিনব্যাপী এই আয়োজনে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কথা বলবেন সুইস ফিল্ম ম্যাগাজিন সিনেবুলেটিনের এডিটর ইন চিফ টেরেসা ভিনা, ক্রোয়েশিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বক্তা আলেকজান্দ্রা মারকোভিচ এবং বাংলাদেশের নির্মাতা ও প্রোডাকশন ডিজাইনার লিটন কর।
আর্ট এক্সিবিশন
৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়ামের থ্রিডি আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ আর্ট এক্সিবিশন, যেখানে দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের নির্বাচিত শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে।
আয়োজন সহযোগী
আয়োজন সহযোগী এ উৎসব আয়োজনে সহযোগিতা করছে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস, অ্যাকশন এইড ও এসএমসি। উৎসব পার্টনার হিসেবে আছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, ঢাকা ক্লাব লিমিডেট, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, থ্রিডি আর্ট গ্যালারি, ভিনটেজ কনভেনশন হল, নরওয়েজিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হগুসন্ড, রিলিজিওন টুডে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, চ্যানেল আই, ওটিটি প্লাটফর্ম দোয়েল, সেন্স ফর ওয়েভ ও ক্লাউডলাইভ।
উদ্বোধন ও সমাপনী
১০ জানুয়ারি বিকাল ৪টায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে উৎসবের উদ্বোধন করবেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হবে চীনা পরিচালক চেন শিয়াং পরিচালিত ‘উ জিন ঝি লু’ (The Journey to No End)।
১৮ জানুয়ারি একই ভেন্যুতে উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সমাপনী দিনে প্রদর্শিত হবে এবারের সেরা পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র।
চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য এবারের চতুর্বিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আরও বর্ণাঢ্য, বহুমাত্রিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সমৃদ্ধ আয়োজন হতে যাচ্ছে—এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজকদের।









