আলোর পথযাত্রী সলিল চৌধুরী—বাংলা সংগীতের এক বিপ্লবী নাম। তাঁর সুরে ছিল প্রতিবাদের আগুন, মানুষের প্রতি অপরিমেয় মমতা, জীবনের সংগ্রামের অনুরণন এবং সময়ের গভীরে থাকা সামাজিক চেতনার স্পর্শ। আধুনিক বাংলা গানের নতুন ধারার অন্যতম স্থপতি হিসেবে তিনি শুধু সুরকার নন; তিনি ছিলেন এক আন্দোলনের প্রতীক, এক সৃজনশীল যুগশিল্পী।
১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তির শতবর্ষ পূর্ণ হলো বুধবার। যার শৈশব কেটেছে আসামের চা-বাগানে- যেখানে প্রকৃতির নিবিড়তা এবং শ্রমিকজীবনের কঠোর বাস্তবতা তাঁকে ছোটবেলা থেকেই গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। বাবা ছিলেন ডাক্তার, পাশাপাশি সংগীত-নাটকের অনুরাগী। ঘরে থাকা পশ্চিমা উচ্চাঙ্গ সংগীতের সংগ্রহ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগই তাঁর শিল্পচেতনাকে অঙ্কুরিত করে।
কলকাতায় পড়াশোনা করতে গিয়ে সলিল চৌধুরীর চিন্তায় জেগে ওঠে রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধ। এই সময় তিনি যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)-এর সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু গান লেখা, সুর করা এবং সাধারণ মানুষের কথা সংগীতে তুলে ধরা। কৃষক-শ্রমিকের রোজকার যন্ত্রণা থেকে শুরু করে ছাত্রযুবাদের স্বপ্ন- সবই তাঁর গানে পরিণত হয় সংগ্রামের ভাষায়।
পঞ্চাশের মন্বন্তর তাঁর গণসংগীতকে মানুষের কণ্ঠে তুলে এনেছিল প্রতিবাদের শক্তি হিসেবে। সেই সময়ে তার সুর করা গান সময়ের দলিল হয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তার সংগীত শুধু বিনোদন নয়- মানুষকে একত্র করেছে, দিয়েছে লড়াইয়ের সাহস।
আধুনিক বাংলা গানেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। মাত্র বিশ বছর বয়সে সৃষ্টি করা ‘গাঁয়ের বধূ’ বাংলা গানের নতুন যুগের সূচনা করে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে আশা ভোঁসলে, লতা মুঙ্গেশকর, মান্না দে- প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত শিল্পীই তাঁর গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রজগতে তিনি ছিলেন এক নবজাগরণের সুরকার। ১৯৫৩ সালের ‘দো বিঘা জমিন’ দিয়ে হিন্দি ছবিতে তাঁর অভিষেক। পরে বাংলা ছাড়াও মালয়ালাম, মারাঠি, তামিল, তেলেগু, ওড়িয়া, কন্নড়সহ অসংখ্য ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সংগীতের ভাষা আসলে একটাই- হৃদয়ের ভাষা।
শুধু সুরকারই নন, তিনি ছিলেন কবি, গীতিকার, গল্পকার, সংগঠক এবং বহু বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী এক দুর্দান্ত শিল্পী। তাঁর লেখা গল্প থেকে নির্মিত ‘রিকশাওয়ালা’-ভিত্তিক চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। তাঁর কাজের পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনই গভীর।
‘ও আলোর পথযাত্রী’ তাঁর অমর সৃষ্টি, যা আজও মানুষের মনে আলো জ্বালায়। গানটি যেন চিরন্তন আহ্বান, জীবনের প্রতি, ভালোবাসার প্রতি এবং অনবরত সংগ্রামের প্রতি।
শতবর্ষে দাঁড়িয়ে সলিল চৌধুরীকে মনে করিয়ে দেয়- এমন শিল্পী শত বছরে একজনই জন্মান। তাঁর সৃষ্টিতে আছে বেদনা ও আনন্দ, প্রতিবাদ ও মমতা, আর আছে সাম্যের স্বপ্ন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের এক সৃজন–বিস্ময়, বাংলা সংগীতের অমর আলোকযাত্রী।









