ঋত্বিক কুমার ঘটক — ডাকনাম ভবা। জন্ম ঢাকায়, শৈশব ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু ময়মনসিংহে। রাজশাহীর বয়ে চলা পদ্মার সঙ্গে ছিল তাঁর চিরন্তন প্রেম। এই সূত্রেই তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপনজন, তবে তাঁর আসল ঘরানা সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তৃত — সৃষ্টিশীল প্রতিভার কারণে তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির প্রিয়।
যদি তিনি সৃষ্টি না করতেন, তবে ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর, এপার-বাংলা ছেড়ে যাওয়া অসংখ্য মানুষদের মতোই হয়তো তিনিও হারিয়ে যেতেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক ভোলার জন্য জন্ম নেননি — ইতিহাস নিজেই তাঁকে মনে রাখে, মনে রাখবে। তাঁকে ভালোবাসা কোনো স্বজনপ্রীতির ফল নয়; কারণ স্বজনপ্রীতি চলে প্রতিভাহীনদের সঙ্গে। ঋত্বিক ঘটককে মানুষ ভালোবাসে তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা, শ্রেণি-বৈষম্যহীন মানসিকতা, এবং সেই বিখ্যাত পাগলাটে জীবনযাপনের জন্য।
দেশভাগ ঋত্বিকের মনে গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছিল। তাঁর লেখনী ও চলচ্চিত্র — উভয়েই সেই বেদনার সাক্ষ্য বহন করে। দেশভাগ তাঁকে মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল এমনভাবে যে, পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে নিজের দেশের মাটিতে চলাচল করার অপমান তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পূর্ববঙ্গে আসেননি।
অবশেষে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি পা রাখেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। কিন্তু এই সফরে চোখে পড়ে মর্মান্তিক দৃশ্য — তাঁর যমজ বোন প্রতীতি দেবীর বিধ্বস্ত সংসার। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধূ প্রতীতি ১৯৭১-এ হারিয়েছিলেন তাঁর শ্বশুরকে; পাকিস্তানি হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল এই মহৎ বুদ্ধিজীবীকে। ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আর ভগ্ন বোনকে দেখে ভেঙে পড়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক।
এই সময়েই প্রতীতি দেবী তাঁর পাগলাটে ভাইয়ের হাতে তুলে দেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণের অর্ধদগ্ধ পাণ্ডুলিপি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। সেই পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে ঋত্বিক ডুবে যান গল্পে। হঠাৎ চিৎকার করে বলেন, “খাতা-কলম দে!” কিন্তু ভস্মীভূত ঘরে কলম পাওয়া গেলেও খাতা আর পাওয়া যায় না। তখন বোন ভবি নিজের সাদা ধবধবে শাড়ি এনে দেন ভাইকে। আর সেই শাড়ির ওপর রাতভর লিখে চলেন ঋত্বিক ঘটক — রচনা করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’–এর চিত্রনাট্য।
সিনেমা জগতে তিনি এক পাগলাটে কবি — যাঁর রক্তে মিশে আছে দেশভাগের বেদনা, নদীর স্রোত, এবং মানুষের চিরন্তন লড়াইয়ের গান।
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই অসামান্য শিল্পীর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে মঙ্গলবার। বাংলাদেশ-ভারতের শিল্প-সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মানুষেরা এদিন তাকে স্মরণ করছেন।









