বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর গত ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করে সরকার গঠন করা হয়।
আজ রোববার (৮ সেপ্তেম্বর) সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১ মাস পূর্ণ হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টাসহ এ সরকারের সদস্যসংখ্যা ২১। দায়িত্ব গ্রহণের আগের তিন দিন দেশে কোনো সরকার ছিল না। অচল হয়ে পড়ে মনোবল ভেঙে যাওয়া পুলিশ বাহিনী। ফলে বেড়ে যায় ছিনতাই-ডাকাতি। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দেয় সহিংসতা। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল এই নৈরাজ্য ঠেকানো। সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর ১১ আগস্ট থানায় ফেরা শুরু করেন পুলিশ সদস্যরা। বিগত সরকারের আইজিপি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠিয়ে নতুন নিয়োগ দেয়া হয়।
দুর্নীতি-অনিয়ম ও দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ, অর্থনীতি থেকে শিক্ষা-সব ক্ষেত্রে যে কঙ্কাল রেখে গেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার- তার সমাধান স্বল্প সময়ে কঠিন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ দ্রুতই নির্ধারণ করা জরুরি বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কেননা এরইমধ্যে নানা পক্ষ নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে সুযোগ নিতে শুরু করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল, সংকট নিরসনে সময়মতো ব্যবস্থা না নেয়া। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া এবং তা বাস্তবায়নে যে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখানোর প্রয়োজন ছিল, সেটিও করতে পারেনি সদ্য ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকার। বরং স্বজনতোষী বিভিন্ন পদক্ষেপ ও গোষ্ঠীর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যস্ত ছিল এই সরকার, যার সুবিধা পেয়েছেন মূলত গুটিকয় ব্যবসায়ী আর ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়–পরিজন। অনেকটাই বিকল হয়ে পড়েছিল পুরো অর্থনীতি।
নতুন সরকার আসার পর অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতৃত্বের বড় পরিবর্তন হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। দুজনেই বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতির লুটপাট নিয়ে আগে সমালোচনা করেছেন।
১০ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের নিয়োগকৃত প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আগের নিয়োগ বাতিল করে সারা দেশে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ২২৭ জন আইনজীবীকে নতুন নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে গত এক মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ শীর্ষ পদের ব্যক্তিরা দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। খালি রয়েছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া বিভিন্ন আইনি সুবিধা এবং মামলার রায় নতুন করে পর্যালোচনা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে, তার পরিবারের সদস্যদেরও মামলা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে হামলা হয়েছে এবং শেখ হাসিনাসহ আগের সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের লাল পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ মিলছে এবং গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। সরকার গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। দুর্নীতি দমন এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি আলাদা কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এছাড়া, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা মেয়র ও চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হয়েছে, যেখানে প্যানেল চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব পালন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।









