নিজের ভবিষ্যত নিয়ে অন্তহীন অনিশ্চয়তায় দিনাতিপাত করতে করতে এলো হ্যালোউইন (Halloween)। হ্যালোউইন একধরনের উৎসব, যা প্রতি বছর ৩১শে অক্টোবর পালিত হয়।
একথা হয়তো অনেকেরই জানা আছে যে, হ্যালোউইন উৎসবে পালিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে ট্রিক-অর-ট্রিট, ভূতের ট্যুর, আজব ভৌতিক পোশাক পরে ক্যান্ডি গ্রহণ ও বিতরণ, ভৌতিক স্থান ভ্রমণ ইত্যাদি।
আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসীরা ১৯শতকে এই ঐতিহ্য উত্তর আমেরিকাতে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলিও হ্যালোউইন উদযাপন করা শুরু করে।
বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকগুলি দেশে হ্যালোউইন পালিত হয়। হ্যালোউইন সম্পর্কে এত কিছু জানা না থাকলেও এবার অনেক কিছুই জানা হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আশেপাশের বাড়ির আঙিনায় নানা ধরনের ভৌতিক স্থাপনা দেখেই এ বিষয়ে কৌতুহল জাগে। তারপর খোঁজ নিয়ে জানা গেল এ বিষয়ে। হ্যালোউইন উৎসবের আগমনকে ঘিরে বাড়িঘর সাজানোর আয়োজন নজরকাড়ার মতো।
নানাভাবে ভূতের আকৃতি এবং প্রতিকৃতি, কালো কাপড় মাথায় দেয়া মানুষের কঙ্কাল, পরিত্যক্ত বাড়িতে গা ছমছম করা মাকড়সার জাল, লাল টকটকে চোখের কালো বিড়াল ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়ে একটি সাজানো পরিপাটি বাড়ির আঙিনাকে কাল্পনিক ভূতুড়ে বাড়িরূপে সাজানো হয়। বেশ খরচাপাতি হয় এই সাজানোর পেছনে। কারো কারো বাড়ির আঙিনা প্রযুক্তির ব্যবহারে এতটাই ভৌতিক আবহ তৈরি করে যে, হঠাৎ করে বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে ভয় পেতে হয়।
তেমনই একটি বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম কয়েক দিন আগে। রাত তখন ১১টা হবে, আবাসিক এলাকার পথ তাই একদম ফাঁকা। চারিদিকে গাছপালা। সুনশান ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ির সামনে বিশাল কালো একটা ছায়ার মতো দেখে হঠাৎ বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। থমকে গিয়ে একটু দাঁড়িয়ে খেয়াল করে দেখলাম বাড়িটার সামনে বিশাল এক কালো জন্তুর মতো, চোখ দুটো লাল, মাথাটা নড়াচড়া করছে।
ক্ষণিকের ভয় কাটিয়ে কিছুটা ধাতস্থ হতেই দেখি, চিতাবাঘের সাইজের একটা বিড়াল, পলিথিন দিয়ে বানানো, মাথাটা ডান-বাম করে দু’পাশে ঘুরছে। অনেকটা একই রকম ক্যারিকেচার দেখলাম দিনের বেলায়। ঘোড়ার গাড়ি চড়ে যাচ্ছে এক ভূত, মাথাটা এপাশ ওপাশ করে তাকাচ্ছে। পুরোটাই পলিথিনের তৈরি, ভেতরে বাতাস ভরা। গাড়ির অন্যান্য আরোহীরাও বেলুনের মত ফোলানো কিম্ভূত চেহারার।
বিশাল বিড়াল দেখার সেইরাতে সাথে একজন ছিল বলে এবং হ্যালোউইন সম্পর্কে আগাম ধারণা ছিল বলে যতটা ভয় পাওয়ার পাইনি, তা না হলে পড়িমরি করে দৌঁড়ে পালাতে হতো। কিন্তু এই সব অদ্ভূতুরে সাজসজ্জার সাথে যে জিনিসটি সবক্ষেত্রেই থাকছে, সেটি হল নাক, চোখ, দাঁত-মুখ খচিত মিষ্টি কুমড়া। এখানকার মিষ্টি কুমড়াগুলো আমাদের দেশের মিষ্টি কুমড়ার তুলনায় অনেক বড়, নিখাদ কমলা রঙের।
হ্যালোউইন উৎসবের জন্য মিষ্টি কুমড়াকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়, ফেলে দেয়া ভিতরের অংশ, বাইরের খোলসটা রেখে তার ওপর কেটে আঁকা হয় ভৌতিক মুখশ্রী। মিষ্টি কুমড়ার সাথে হ্যালোউইন এর সম্পর্ক খুঁজতে যেয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। তবে ফসলের মৌসুমের শেষপ্রান্তে আমেরিকাতে সবচেয়ে ব্যাপকভাবে যে ফসলটি উৎপন্ন হয় সেটি হচ্ছে- মিষ্টি কুমড়া। এই কারণেই মিষ্টি কুমড়ার গায়ে খোদাই করা হয় ভূতুরে অবয়ব। আর এই ভূতুড়ে অবয়বের উদ্দেশ্য হ্যালোউইন দিবসে আত্মাকে আমন্ত্রণ জানানো।
একই উদ্দেশে সবাই নানান ধরণের ভূতুড়ে সাজে নিজেকে সাজায়। এই সাজগোজের মধ্যে নানা ধরনের ভয়ংকর প্রাণীর রূপ নেয়ার প্রচেষ্টা যেমন থাকে তেমনি থাকে প্রিয় প্রাণী ও পাখিরূপে নিজেকে সাজানোর অক্লান্ত শৈল্পিক প্রচেষ্টা।
হ্যালোউইন এর ইতিহাস খোঁজাখুঁজি করে নানা রকম ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে মূল বিষয় হচ্ছে খৃষ্টানরা এটা প্রথম চালু করে। মৃত মানুষের আত্মা এই দিনটিতে লোকালয়ে বেড়াতে আসে। আর তাদেরকে স্বাগত জানাতেই চারিদিকে সর্বাত্মক ভৌতিক আয়োজন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অতিথি আত্মাদের খুশি করতেই এই ভৌতিক আয়োজন।
আত্মাদের ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে সবার এই আজগুবি ভয়ংকর সাজ। ভাবখানা এমন যেন, অতিথি মৃতের আত্মারা দেখতেও এমন কাল্পনিক ভৌতিক, কদাকার, বিভৎস। অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। তা সে যাই হোক, সেদিনের সন্ধ্যাটিকে পবিত্র সময় বলে মনে করেই পালন করা হয়। হ্যালোউইন কথার অর্থ হচ্ছে পবিত্র সন্ধ্যা। সন্ধ্যাটি খৃষ্টানদের কাছে পবিত্র মনে হলেও পালন করছে। সেই পালনের মধ্যে ধর্মীয় কিছু নেই, বিষয়টা সংস্কৃতি হিসাবে গ্রহণ করেছে সবাই। অদ্ভূতুড়ে সাজের প্রতিযোগিতা চলে, যা না দেখলে বোঝার উপায় নেই।
মেক্সিকো এবং তার আশেপাশের দেশে ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত হ্যালোউইন এর আদলেই পালিত হয় – ডে অফ দে ডেড। অন্যসব দিবসের মতো এই দিবসটি নিয়েও চলে বিশাল বাণিজ্য। নানা ধরণের পোশাক, সাজসজ্জার উপকরণের পসরা সাজিতে বসে দোকানীরা। মেকআপ আর্টিস্টদের কদর বেড়ে যায়। অনেকের মেকআপ হলিউডের ফিল্মি মেকআপের চেয়ে কোনোভাবেই কম নয়। সেই সব সাজসজ্জা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দোকান-পাটে, বাড়ি ঘরের দরজায়।
আর বাড়িঘর দোকানপাটের সেই সব দরজায় দরজায় আরেকদল অপেক্ষা করে ক্যান্ডি বিতরণের জন্য। শতপদের ক্যান্ডি বিতরণ চলে এই দিনটিতে। এ কারণে শিশুরা এই দিনটির অপেক্ষায় থাকে। হ্যালোউইন এর সন্ধ্যার পর সব শিশুরাই ঝুড়ি ভর্তি ক্যান্ডি নিয়ে ঘরে ফেরে, সাথে বড়রাও। এখন হ্যালোউইন এর মূল আকর্ষণ হচ্ছে, নানা ধরনের সাজ এবং ক্যান্ডি বিতরণ। আমরা যে এলাকায় থাকি সেটির পাশেই জামাইকা এভিনিউ, এখানে প্রচুর লোক সমাগম ঘটে।
সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। কত সাজেই না সাজতে পারে মানুষ। এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে রূপকথার দেশে হারিয়ে যাওয়া যায় সহজেই। দোকানে ঘুরে ঘুরে ভূতুড়ে, অদ্ভূতুড়ে সাজে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই যে অকৃত্রিম আন্তরিকতা ও উদ্দীপনা নিয়ে ক্যান্ডি বিতরণ ও সংগ্রহ করে, তা সত্যিই অতুলনীয়।
হ্যালোউইন উৎসবে সামিল হতে আমার পুত্ররাসহ বাসার অন্য শিশুরাও বেরিয়ে পড়ে, সাথে পরিবারের অন্যান্যরাও। শিশুদের সাথে কিছুক্ষণের হারিয়ে যাই ছোট্টবেলার রাক্ষস, খোক্ষস, ভূত-প্রেত, জন্তু-জানোয়ার, পরীর রাজ্যে। মুখ ও মুখোশ একাকার হয়ে যায়। আর ভাবি আমাদের জীবনটা কত অদ্ভূত। প্রতিদিন কত অদৃশ্য মুখোশপরা মানুষের মুখোমুখি হই আমরা। আজাদ রহমানের গানটি মনে পড়ে যায়, মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায়, মানুষকে কী করে চিনবে বলো?






