কলকাতার নির্মাতা অপরাজিতা ঘোষের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’-এ অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের অভিনেতা জুলহাজ জুবায়ের। এটি নিয়ে অসংখ্য সংবাদ ছাপা হয়ে গেছে। সংবাদটি পুরনো হলেও নতুন খবর হলো, এই ছবিটি এবার দেখতে পারবেন ঢাকার দর্শক।
না, সিনেমা হলে আপাতত মুক্তি পাচ্ছে না ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অষ্টাদশ আসরে ‘সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বিভাগে এই ছবির দুটি প্রদর্শনী রয়েছে। এরমধ্যে ১৫ জানুয়ারি বিকাল ৫টায় শাহবাগের পাব্লিক লাইব্রেরি মিলনায়তন ও ১৮ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে ছবিটি দেখানো হবে।
ছবির প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকবেন নির্মাতা অপরাাজিতা ঘোষ, এমনটাই জানিয়েছিলেন ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র জুলহাজ। এরইমধ্যে চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে ঢাকায় অবস্থান করছেন অপরাজিতা। রবিবার সন্ধ্যায় ছবিটি নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন কলকাতার এই নির্মাতা ও বাংলাদেশের অভিনেতা।

এরআগেও ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের নির্মিত ডকু ফিকশন নিয়ে এসেছিলেন অপরাজিতা ঘোষ। সেই সূত্র ধরেই তার কাছে জানতে চাওয়া হয়: ‘ডান্স অফ জয়’ নিয়ে ২০১৮ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছিলেন, মাঝখানে এক বছর বিরতির পর ২০২০ সালে ফিচার ফিল্ম নিয়ে এলেন। অনুভূতি কেমন?
হেসে উত্তর দেন আত্মবিশ্বাসী অপরাজিতা। বলেন, যেকোনো নির্মাতার কাছে তার সব নির্মাণই স্পেশাল। ‘ডান্স অফ জয়’ আমার কাছে সব সময় স্পেশাল হিসেবে থাকবে, কারণ এটি ছিল আমার প্রথম কাজ। ‘ডান্স অফ জয়’-এর মতো এমন একটি কাজ এর আগে কেউ করেনি।
ঢাকায় আসার আগে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবসহ একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’। সবখানেই প্রশংসিত হয়েছে ছবিটি। বিশেষ করে ছবির ফর্ম, কন্টেন্ট নিয়ে নির্মাতা যে এক্সপেরিমেন্টের মধ্য দিয়ে তার ছবিকে নিয়ে গেছেন, সিনেসমালোচকদের কথায় সেটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে চলচ্চিত্রকে কোনো বিভাজনে দেখতে রাজি নন অপরাজিতা।
চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে নির্মাতা ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’-এর কথা তুলে ধরে বলেন, ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’ আমার কাছে সারাজীবন স্পেশাল হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে আমি যতো ছবিই বানাই না কেন, কিন্তু এটা আমার কাছে বিশেষ জায়গা নিয়ে থাকবে। কারণ ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’ আমার প্রথম ফিচার ফিল্ম। এই ছবির মধ্যে যে ফরম নিয়ে আমি কাজ করেছি, সেটা আজ অব্দি এখনো হয়নি।
নিজের বানানো প্রথম ডকু ফিকশনের সুখস্মৃতির কথা উল্লেখ করে নির্মাতা বলেন, আমার ‘ডান্স অফ জয়’-এর ক্ষেত্রে যে রকম এক্সপেরিমেন্ট এপ্লাই করেছি, আমার প্রথম ফিচার ফিল্ম-এর মধ্যে দিয়েও এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছি। একটা ডকুমেন্টারি যে ছবি হতে পারে, এবং সেটা দেখার জন্য প্রায় দরোজা ভেঙেছে লোকজন হলে ঢুকতে পারে, সেটাও যেমন ‘ডান্স অব জয়’-এর মধ্য দিয়ে করতে পেরেছি। একইভাবে ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’-এর মধ্য দিয়ে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবেও এরকম সাড়া পেয়েছি।

নিজের শহরে নিজের বানানো প্রথম ফিচার ফিল্ম দেখানোর অনুভূতি কেমন ছিলো? জানতে চাইলে উচ্ছ্বসিত অপরাজিতা জানালেন: কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানোর পর ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’ ছবিটির প্রশংসা করেছেন সবাই। বিশেষ করে এক্সপেরিমেন্ট করাটাকে সকলে উৎসাহ দিয়েছেন। শুধু ভারতবর্ষের দর্শক নয়, ভারতবর্ষের বাইরে থেকে যারা ছবিটি দেখেছেন সেসব দর্শকও ছবিটি নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে আমার যেটা ভালো লেগেছে, সব সময় বলা হয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম মানে একটা টার্গেট অডিয়েন্সের জন্য। সিনে বোদ্ধা,ফিল্ম ক্রিটিক কিংবা সাংবাদিকদের জন্য। কিন্তু এই উৎসবে সেই ধারণা ভেঙে ফেলে প্রচুর সাধারণ দর্শক আমার ছবিটি দেখেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মধ্যেও কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রচুর মানুষ ছবিটি দেখেছেন। উপচেপড়া হলের সিঁড়িতে বসে লোকজন আমার ছবি দেখেছেন, সাধারণ মানুষ এসে আমার সাথে ছবিটি নিয়ে তাদের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। আমার মনে হয় এইটাই আমার এই ফিল্ম বানিয়ে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে একটা বিভাজন দেখি,‘ক্লাস ও মাস’। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বিভাজনগুলো ভেঙে ফেলা। আমি একা হয়তো পারবো না। কিন্তু আমি কাজে বিশ্বাসী, কাজের মধ্য দিয়ে এই বিভাজনগুলো ভেঙে ফেলতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব।
‘মিস্টিক মেমোয়্যার’-এর বাণিজ্যিক মুক্তি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আপাতত আছে কিনা, জানতে চাইলে নির্মাতা বলেন: এই মুহূর্তে শুধু ফেস্টিভালগুলোতে ছবিটি দেখানোর কথাই ভাবছি। ছবিটি নিয়ে যেহেতু কথা হচ্ছে, তো আপাতত এর মধ্যেই থাকতে চাই। আর রিলিজের বিষয়টা শুধু ঢাকা কিংবা কলকাতাতেই নয়; বরং বিভিন্ন দেশের সাথে আমার কথা হচ্ছে। এটা হয়তো এরকম ছবি নয় যে, প্রচুর হলে একসঙ্গে রিলিজ হবে, কিন্তু অনেকগুলো জায়গায় রিলিজ হতে পারে এরকম প্ল্যান আমাদের এখন পর্যন্ত আছে।
এদিকে ছবিতে অভিনয় করে মুগ্ধ জুলহাজ। ছবির গল্পের প্রেমে যেমন তিনি পড়ে আছেন, তেমনি পড়ে আছেন কলকাতা শহরের প্রেমে! যে প্রেম ও মুগ্ধতা নিয়ে এখনো দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

জুলহাজ তার অভিনীত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’ নিয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবে: কলকাতা শহরের মধ্যে যে মায়া রয়েছে, সেই মায়াই যেন আমাদের ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’-এ চিত্রায়িত হয়েছে। পুরো বসন্তের সময় আমরা শুটিং করেছি। বসন্তের ফুলের রং গন্ধ আমাদের ছবিতে রয়েছে। দর্শক বসন্তের সেই জীবন্ত রূপ, রস ছবিটি দেখলে খুঁজে পাবেন বলেই বিশ্বাস।
ছবির গল্প সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই অভিনেতা জানান, এটা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প। যে গল্পটা হয়তো আমরা বলি না, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিযোগিতার কারণে এই গল্পগুলি আমরা বাজেভাবে হারিয়ে ফেলেছি। নিজেদের এখন আর আমরা খুঁজে পাইনা। মূলত নিজেদের খুঁজে পাওয়ার গল্পই হলো ‘মিস্টিক মেমোয়্যার’। মানুষের যে প্রত্যেকটা স্বাভাবিক অনুভূতি আছে সেই অনুভূতিগুলো খুঁজে পাওয়ার গল্প আছে ছবির পরতে পরতে। জুলহাজ বলেন, মানুষ এই ছবিটি দেখে যখন হল থেকে বের হবে তখন তার পাঁচটা ইন্দ্রিয়’র কথা উপলব্ধি করতে শুরু করবেন।








