হৃদপিন্ডের রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমেনি
এঞ্জিওগ্রাম বলছে তো সেটাই।
আমিও বলি তাই…
জমলে জমতে পারে প্রিয়জনের জন্য ভালোবাসার প্লাক।
বলি, তাতেও কি উপসর্গ সেই, বুক ব্যথাই…!!
প্রিয়জনের জন্য বুকব্যথাটা সারছে না। তাদের সান্নিধ্যের জন্য মনটা খুবই গুমোট হয়ে ছিলো। অজানা গন্তব্যের হতাশায় দু’পা ভারী লাগতো, কোথাও যেতে ইচ্ছে করতো না। যে কারণে নিউইয়র্ক এসে খুব একটা বের হই নি। এর আগে ২/১দিন ট্রেন এবং বাসে চড়ে সোসাল সিকিউরিটি অফিস এবং স্কুলে যেতে হয়েছে। এখানে এলে সবাই সর্বপ্রথম সোসাল সিকিউরিটি অফিসে যায়। কারণ সোসাল সিকিউরিটি কার্ড খুব জরুরি একটা সরকারী কাগজ। এটি সবকিছুতেই কাজে লাগে। পড়াশুনা, চাকুরি- ভাতা, চিকিৎসা সহযোগিতা, ব্যাংক একাউন্ট খুলতে সবকিছুতেই সোসাল সিকিউরিটি নাম্বার কাজে লাগে।
অতিব্যক্তিগত গোপন নথি এই সোসাল সিকিউরিটি কার্ড। সোসাল সিকিউরিটি কার্ডের পরই আসে গ্রীনকার্ড। তার আগে ‘স্টেট আইডি’ করতে হয়। এখানে স্টেট আইডি’র সাথে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স একসাথে করা যায়। চলাফেরায় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে প্রথম দিকে এটি লাগে। পাশাপাশি বেনিফিট কার্ড এবং হেলথ ইনসিওরেন্স করতে হয় চিকিৎসার জন্য।
আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় ক্রমান্বয়ে এগুলোর জন্য দরকারী কাজকর্ম সবই একের পর এক করে নিয়েছি। অফিসিয়াল কাজকর্ম শেষে এখন অপেক্ষার পালা। কাজের জন্য যা-ও বের হয়েছি কিন্তু এখন আর বাসা থেকে বের হওয়া হয়নি।
নিউ ইয়র্কে এসেছি ইতোমধ্যে ২সপ্তাহের বেশি হয়ে গেছে। তৃতীয়বারের মত আজই সকালে বের হলাম ঢাকা থেকে আসা ফটোসাংবাদিক বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। জাতিসংঘের ৬৯তম সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য প্রায় ১৮০জন সফরসঙ্গী নিয়ে নিউ ইয়র্ক এসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতবড় বিশাল বহরে দু’য়েকজন পরিচিত থাকবে না, তা কী করে হয়!
খুব ভাল লাগলো ঢাকার সাংবাদিক বন্ধুদের পেয়ে। অনেকদিন পর আবারো নিউ ইয়র্কবাসী ফটোসাংবাদিক নীহার সিদ্দিকী’র বাসায় কিছুক্ষনের জন্যে Yeasin Kabir Joy, Abu Taher Khokon, Sanaul Haque এবং Saiful Kallol এর সাথে জমেছিল দেশী স্টাইলে পুরনো আড্ডা…।
সেপ্টেম্বরে এখানে স্কুল শুরু হয়। দুই ছেলেকেই স্কুলে ভর্ত্তি করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে প্রতিটি এলাকাতেই বিভিন্ন গ্রেডের স্কুল রয়েছে। মেঝ ছেলে দিমিত্রি এলাকার একটি ব্লু-রিবন স্কুলে ভর্ত্তি হয়েছে। ব্লু-রিবন স্কুল মানে প্রথম গ্রেডের স্কুল। দিমিত্রি বাংলাদেশে ক্লাস টু-এ পড়তো, এখানে ভর্ত্তি হয়েছে গ্রেড-থ্রি’তে। বয়স অনুযায়ী এটি হয়েছে।
অন্যদিকে বড় ছেলে শীর্ষ একটু দূরে আরেকটু ভালো স্কুলে ভর্ত্তির সুযোগ পেয়েছে, তাও দুই ক্লাস উপরে গ্রেড-নাইনে। মেঝছেলের স্কুল বাসার কাছে, ২০মিনিটের হাঁটা পথ। আমরা যে আত্মীয়ের বাসায় উঠেছি, সেই বাসার আরও দু’জন একই স্কুলে যায়, তাই ওর স্কুলে যাওয়া আসা নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে আছি। কিন্তু এলাকার স্কুলে আসন খালি না থাকায় ওকে পাঠানো হয় দূরের একটা স্কুলে। স্কুলের নাম- ফরেস্ট হিল স্কুল।
দূরে পাঠানোতে প্রথমে মনটা খারাপ হলেও পরে দেখা গেল, ভালোই হয়েছে। স্কুলটা বেশ ভালো। যাই হোক, দূরে বলে গত কয়েকদিন ধরে নিউ ইয়র্কে বড় ছেলেকে স্কুলে আনা নেয়ার কাজ করছি। এখানকার পথ ঘাট চেনার তরিকা ভিন্ন। অন্যদের সাহায্য নিয়ে নিজে চিনে, ছেলেকেও চিনাচ্ছি। প্রথমে স্কুলের সামনে, পরে স্কুল থেকে একটু দূরে হাঁটার পথে নামিয়ে দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকি। বেশিক্ষণ তাকাতে পারি না চোখে জল আসে। পরক্ষণেই বাবাকে নিয়ে কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষা, বুয়েট ও মেডিকেলে ভর্ত্তি পরীক্ষার সময় বাবার স্বপ্নাবিষ্ট, উদ্বিগ্ন যে চেহারা দেখেছিলাম।
আজ বিনা আয়নাতেই আমি নিজের মুখশ্রীতে সেই চেহারার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। শীর্ষ আজ একা একা স্কুলে গেলো। যে শীর্ষ দেশে কখনো গাড়ি ছাড়া স্কুলে যায়নি বাসা থেকে একা বের হয় নি, সেই শীর্ষ এখন তিনবার ট্রেন চেঞ্জ করে স্কুলে যাচ্ছে। স্কুলের পথে বিদায় দিয়ে পিছন থেকে শীর্ষ’র পথের দিকে স্থির দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে থাকি, শীর্ষ পা ফেলে এগিয়ে যায়, অতিক্রম করে যায় দৃষ্টির সীমানা…..






