তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু আলোচিত বিষয়ে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে করা রিটের রুল শুনানিতে বুধবার রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা একথা বলেন।
তত্ত্বাবধায়ক (কেয়ারটেকার) সরকারের মাধ্যমে দেশে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে তা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিল উল্লেখ করে শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বিলোপ করায় বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। কেয়ারটেকার বাতিল করে বাংলাদেশের গনতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছে। সংবিধানের বুকে কুঠারাঘাত করা হয়েছে।’
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে মানুষের অধিকার হরনের পদক্ষেপ উল্লেখ করে এটিকে “কালারঅ্যাবল লেজিসলেশন” বলে অভিহিত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। এসময় তিনি বলেন, ‘এই সংশোধনী সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা। একটি নির্দিষ্ট দলের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করা ও ফ্যাসিজমকে প্রতিষ্ঠা করতেই ত্রয়োদশ সংশোধনীকে পাশকাটিয়ে (বাইপাস করে) এই সংশোধনী আনা হয়।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গ টেনে শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে এই নয় যে, হাজার হাজার মানুষকে গুম করা। বিচার বহির্ভূত খুন করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে এটা নয় যে, ৬০ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে এগুলো হতে পারে না।’
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা জাতির পিতা’র বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘উনি মুক্তিযুদ্ধের সময় অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। ওনার অবদান অনস্বীকার্য। তবে আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় আমরা (উই) বলা হয়েছে। সেখানে একক কোন ব্যক্তি প্রাধান্য নেই, ব্যাক্তিপুজার সুযোগ নেই।’
মানুষকে ভয়ের সাংষ্কিতিতে রাখা, মানুষের কণ্ঠ রোধ করা ও গনতান্ত্রিক সংগ্রামকে দূরে রাখতেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ (এ) (বি) আনা হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এটি মৌলিক অধিকারসহ সংবিধানে থাকা নাগরিকদের অধিকারকে আঘাত করেছে। পার্লামেন্টের সুপ্রিমেসিকে আঘাত করেছে। ডিকটেটরশিপকে টিকিয়ে রাখার জন্যই এটি করা হয়েছে।’
এদিকে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধানটি বাতিল করে মৌলিক বিষয়ে জনগণের মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করা হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল গণভোটের বিধানটি পুনর্বহালের পক্ষে শুনানিতে যুক্তি তুলে ধরেন।
এছাড়া, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা বাঙালি জাতির বিষয়টির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে বলেন, টেরিটোরিয়াল জুরিসডিকশন অনুযায়ী দেশের নাগরিক হিশেবে বাংলাদেশী পরিচয়ই একক ও অভিন্ন। আর আমাদের এখানে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষও রয়েছেন যারা বাঙালি না। তাই সংবিধানে বাঙালি জাতি উল্লেখ থাকলে তারাও এটার মধ্যে চলে আসতে বাধ্য হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা ৭ মার্চের ভাষণ ও মুজিবনগর সরকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংবিধানের অংশ হবার যোগ্য না উল্লে করে অ্যাটর্নি জেনারেল প্রখ্যাত আইনজীবী মাহমুদুল ইসলামের বইয়ের রেফারেন্স তুলে ধরেন।
আর সমাজতন্ত্র নয় গনতন্ত্রই আমাদের সংবিধানের মূল স্প্রিট উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিতে ”সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি” কে পুনর্বহালের যুক্তি তুলে ধরেন।
বুধবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রুলের পঞ্চম দিনের শুনানি শেষ হয়। এদিন অ্যাটর্নি জেনারেলের শুনানির পর শুনানি শুরু করেন জামায়াতের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
রুলে শুনানিতে সুজনের পক্ষে আছেন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরিফ ভূঁইয়া। বিএনপির পক্ষে আছেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল। জামায়াতের পক্ষে আছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। ইনসানিয়াত বিপ্লব দলের পক্ষে আছেন আইনজীবী আব্দুর রউফ ও ইশরাত হাসান। এছাড়া রুল শুনানিতে পক্ষভুক্ত হওয়া সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার জুনায়েদ আহমেদ চৌধুরী।
আর রাষ্ট্রপক্ষে আছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদ উদ্দিন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সংবিধানের ওই সংশোধনী আনা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বৈধতা নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি গত আগস্টে হাইকোর্টে রিট করেন। এই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন। এই রুল শুনানির জন্য ৩০ অক্টোবর দিন ধার্য করেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই রুল শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে পক্ষভুক্ত হয় বিএনপি ও জামায়াত। এছাড়া পক্ষভুক্ত হয় নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ইনসানিয়াত বিপ্লব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাইখ মাহদী, নিশাত মাহমুদ, নাফিউল আলম সুপ্ত, মো: সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপের পাশাপাশি জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয়। আগে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করার বিধান থাকলেও ওই সংশোধনীতে পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিষয়টি সংযোজন করা হয়।









