অন্যান্য

ঈদেও অনাহারে-অর্ধাহারে ঢাবির হলে থাকা ছাত্ররা

ঈদেও অনাহারে-অর্ধাহারে ঢাবির হলে থাকা ছাত্ররা

ঈদের মধ্যেও বিভিন্ন প্রয়োজনে হলে থেকে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্দশা নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন সাংবাদিক শরীফুল হাসান।

ফেসবুকে তিনি লিখেন, “ঈদের দিনে অর্ধাহা‌রে বা অনাহা‌রে থাকতে হ‌লে কিংবা খাবার খে‌তে দি‌য়ে কাউকে তুচ্ছ তা‌চ্ছিল্য করা হ‌লে সেটা খুব দুঃখজনক। অার তা য‌দি হয় ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের ছাত্র‌দের সা‌থে সেটা তো নির্মম। গতকাল রাত থে‌কে অাজ পর্যন্ত বিশ্ব‌বিদালয় থে‌কে অনে‌কেই অামা‌কে ফোনে বা ইনব‌ক্সে এই ঘটনা জা‌নি‌য়ে‌ছেন। স‌ত্যি স‌ত্যি এমনটা হ‌য়ে থাক‌লে তা চরম দুঃখজনক।

ত‌বে এ নি‌য়ে কথা বলার অাগে অা‌মি নিজের অ‌ভিজ্ঞতাটা শেয়ার ক‌রি। বিশ্ব‌বিদ্যালয় জীব‌নে হ‌লে খাবার কষ্ট ক‌তোটা তীব্র সেটা যারা হ‌লে থাকেন খুব ভা‌লো ক‌রে জানান। এতো নোংরা এবং নিম্নমা‌নের খাবার হ‌তে পারে সেটা যারা না খে‌য়ে‌ছেন কল্পনাও কর‌তে পারবেন না। অা‌মি জহরুল হক হ‌লে থাকতাম। দু এক‌দিন বা‌দে বে‌শিরভাগ সম‌য়ে অা‌মি গাউসুল অাজম বা চাংখার পু‌লে খে‌য়ে‌ছি। কিন্তু ঈদের সময় সব বন্ধ থাকতো এমনক‌ি হল ক্যা‌ন্টিনও। তখন যারা নানা কার‌ণে হ‌লে থাকতো তা‌দের জীবনটা ছিল ভয়াবহ বিষন্নতার। মান‌সিক কষ্ট তো অা‌ছেই না খেয়ে থাকার কষ্টও অা‌ছে।

অামার বিশ্ব‌বিদ্যালয় জীবনে একবার অা‌মি হ‌লে ছিলাম খুব জরুরী একটা কার‌ণে। সেটা ছিল কোরবা‌নির ঈদ। দেখলাম হ‌লে একটা বিরাট গরু অানা হ‌য়ে‌ছে। এটা না‌কি ঈদের দিন কোরবা‌নি দেয়া হবে ছাত্রদের জন্য। ঈদের অাগের দিন শুনলাম ঈদের দিন খে‌তে হ‌লে অাগে অাই‌ডি কার্ড দি‌য়ে টো‌কেন নি‌তে হ‌বে। বিষয়টা শুনে এতোটাই কষ্ট পে‌য়ে‌ছিলাম যে ওই প‌থে অার যাই‌নি। ঢাকা শহ‌রে অামার অনেক প‌রি‌চিতজন থাক‌লেও কোথাও না গি‌য়ে রেস্টু‌রেন্ট খুঁজতে লাগলাম। অামার মনে অা‌ছে গ্রীন রো‌ডের একটা হোটে‌লে অা‌মি প্রচন্ড মন খারাপ ক‌রে ভাত খেলাম।

রা‌তে হ‌লে এসে শু‌নে‌ছি সাধারণ অ‌নেক ছে‌লে‌ খাবা‌র না পে‌লেও ছাত্র‌নেতারা ইচ্ছেম‌তো খে‌য়ে‌ছে অাবার বক্স ভ‌র্তি ক‌রে নি‌য়ে এসে‌ছে। শুধু ঈদ নয় যে কোন বি‌শেষ দি‌নে অ‌া‌মি দেখতাম একই চিত্রও। নেতাদের রুমের সাম‌নে অ‌র্ধেক খাওয়া অসংখ্য প্যাকেট অার সাধা‌রণ ছে‌লে‌রা খাবার পাচ্ছেই না।

ইতিহাস থে‌কে এবার ২০১৬ সা‌লের কোরবা‌নির ঈদে ফি‌রি। বি‌সিএসসহ নানা পরীক্ষার কার‌ণে এবার উল্লেখ‌যোগ্য সংখ্যক ছে‌লে‌মে‌য়ে হ‌লে থে‌কে যায়। তারা অামাকে জানাল হল প্রশাসন ব‌লে‌ছে ঈদের দিন যারা খে‌তে চায় তা‌দের কুপন নি‌তে হ‌বে। ছাত্ররা কুপন অানতে গে‌লে বলা হয় অাবা‌সিক অাই‌ডিকার্ড দেখা‌তে হবে। কিন্তু হ‌লে অবস্থানরত ছাত্রদের তিনভাগের দুই ভাগ যে অনাবাসিক তা তো হল প্রশাসনের অজানা থাকা‌র কথা নয়। ফ‌লে ঈদের দিন অ‌নেক ছে‌লে‌কে না খে‌য়ে থাকতে হ‌য়ে‌ছে। অ‌নেকে না‌কি শুকনা খাবার খেয়ে‌ছেন। অ‌নেকে অাবার খাবা‌রের মান নি‌য়েও প্রশ্ন তু‌লে‌ছেন।

ক‌বি জসীমউ‌দ্দিন হ‌লের এক ছাত্র লিখে‌ছে, “ফাইনাল পরীক্ষার কার‌ণে হ‌লে ছিলাম। হ‌লে যারা আবাসিক তাদেরকে ঈদের দিন দুপুরের খাবারের জন্য আবেদন করতে বলেছিল, অনেকেই এই অবেদন করতে পারেনি। যারা আবেদন করতে পারেনি তাদেরকে খাবার দেয়া হয়নি। আর যাদেরকে খাবার দেয়া হয়েছে তাদেরকে হ‌লের হাউজ টিউটর‌দের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের কথা শুনতে হয়েছে। যেমন তোমার নাম কি? তোমার মা বাবা নাই? তোমার বা‌ড়ি কই? বা‌ড়ি‌তে যাওনি কেন? ইত্যা‌দি ইত্যা‌দি।

ওই ছাত্র অারও লি‌খেছে যারা ঈদের দিনেও ছাত্রদের একবেলা খাবার দিতে দ্বিধাবোধ করেন, তাদের জন্য গভীর সমবেদনা। শিক্ষক নামক শব্দটিকে আপনারা সার্কাসে পরিণত করেছেন। আল্লাহ আপনাদের মনের দীনতা দূর করুক। সারাদেশে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে থাকা ছাত্ররাই হয়তো ঈদের দিনে অনাহারে/ অর্ধাহারে আছে।

সাধারণ ছে‌লে‌দের এই কথাগু‌লো অামাকে ভীষন পীড়া দি‌য়ে‌ছে। অা‌মি বিষয়টা নি‌য়ে উপাচার্য স্যা‌রের সা‌থে কথা বলবো।

অা‌মি দীর্ঘ‌দিন হ‌লে ছিলাম। অা‌মি সংকটটা জা‌নি। তাই ঈদে ঢাকায় থাক‌লে জোর ক‌রেই পর‌ি‌চিত‌দের ঈদের দিন বাসায় অানার চেষ্টা ক‌রি। মা‌ঝে ম‌ধ্যে এম‌নি‌তেও হ‌লের ছে‌লেমে‌য়েদের বাসায় জোর ক‌রে নি‌য়ে অ‌া‌সি। য‌দিও সেন্ট্রাল রোড ছে‌ড়ে পুরান ঢাকায় অাসায় সেই কাজটা বি‌ঘ্নিত হ‌চ্ছে। ত‌বে অামার ম‌নে হয় হ‌লের ছে‌লেমে‌য়েদের খাবার সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরী।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ শিক্ষকদের কাছে অামার অনুরোধ অাপনারা সবসময় বলেন ছাত্ররা অাপনাদের সন্তানের মতো। অাসলেই যদি অাপনারা নিজেদের সন্তান মনে করেন তাহলে হলগুলোতে ছেলেমেয়েরা কী খায় সারাবছর সেটা দেখুন। পারলে নিজে সেই খাবার খান বা সন্তানদের খাওয়ান। অার না পারলে খাবারের মানটা বাড়ানোর উদ্যোগ নিন। কারণ পাঁচ-ছয় বছর হলে থেকে খেয়ে ছেলেমেয়েরা নানা ধরনের অসুখে পড়ে। অাপনি নিশ্চয়ই চান না অাপনার সন্তান অসুস্থ থাকুক। কা‌জেই হ‌লের খাবা‌রের সমস্যা সমাধান করুন।

অামার দ্বিতীয় প্রস্তাব দুই ঈদ নি‌য়ে। যে‌হেতু কিছু ছে‌লে‌মে‌য়ে দুই ঈদে হ‌লে থেকে যায় কা‌জেই তিন‌দিন তা‌দের ভা‌লো মন্দ খাওয়া‌নোর দা‌য়িত্ব বিশ্ব‌বিদ্যালয় ও হল প্রশাসন এবং শিক্ষকরা নিতে পা‌রেন। অামার সামর্থ্য থাক‌লে অা‌মি একাই সবার দা‌য়িত্ব নিতাম এবং মমতা দি‌য়ে সবাইকে খাওয়াতাম। ত‌বে অ‌া‌মি একা যে‌হেতু পার‌ছি না অামরা সা‌বেক ছাত্ররা এবং বি‌ভিন্ন বিভাগ ও হ‌লের অ্যালামনাই অ্যা‌সো‌সি‌য়েশন দা‌য়িত্ব নিতে পারি। অাগামী ঈদের অা‌গেই এ বিষ‌য়ে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হ‌বে।

অা‌মি নি‌শ্চিত অামরা সবাই মি‌লে দা‌য়িত্ব নি‌লে অল্প কিছু ছে‌লে‌মে‌য়ের মু‌খে হা‌সি ফোটা‌নো অসম্ভব কিছু নয়। অার অপ‌রের মু‌খে হা‌সি ফোটা‌নোর চে‌য়ে জীব‌নে বড় অানন্দ অার কী হ‌তে পারে! সবাই‌কে ঈদের শু‌ভেচ্ছা।”

বিষয়:ঈদঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিবেদক

চ্যানেল আই অনলাইন

চ্যানেল আই অনলাইন

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…