নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ হামলার সময় মসজিদের ভেতরেই ছিলেন বাংলাদেশের ওমর জাহিদ। পরে তিনি সাংবাদিকদের সামনে নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতার বর্ণনা দেন।
বিবিসিকে দেওয়া বর্ণনায় তিনি বলেন: নিউজিল্যান্ড একটি ভাল দেশ, এটা আমরা বিশ্বাস করতাম এবং এখনো বিশ্বাস করি। আমি প্রায় চার বছর হল নিউজিল্যান্ডে আছি। আমরা হ্যাপি ছিলাম, খুব সুন্দর জীবন যাপন করছিলাম। ওই দিন ছিল শুক্রবার, আমরা মুসলমানরা প্রতি শুক্রবারে জুম্মার নামাজ পড়তে মসজিদে একত্রিত হই। নামাজের জন্য আমি আমার কাজ শেষ করেছি দুপুর সাড়ে বারোটায়। জুম্মার নামাজ নিউজিল্যান্ড সময় শুরু হয় দুপুর ২টায়। বাসা থেকে বের হয়ে যখন আমি মজজিদে পৌঁছালাম তখন সম্ভবত দুপুর ১টা বেজে ৫ কিংবা ১০ মিনিট হবে। পৌঁছে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার পর আমি সেকেন্ড কাতারে দাঁড়াই, ঠিক মুয়াজ্জিনের পেছনে। আমার সঙ্গে আমার কিছু বন্ধু ছিল, ইমাম সাহেব যখন মসজিদে প্রবেশ করেন তখন প্রায় দেড়টা বেজে গেছে। ইমাম সাহেব যখন মিম্বারের উপরে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম বলে বয়ান শুরু করবেন তখন বাইরে প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পাই।
হামলার বর্ণনা দিয়ে জাহিদ বলেন: আমরা বাইরে থেকে বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাম। শুরুতে ভেবেছিলাম আতশবাজি কিংবা ইলেকট্রিসিটির কোন শর্ট সার্কিটে ঘটনা ঘটেছে। এরপরে পেছনে মানুষজন দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু করলো। তখনও বুঝতে পারিনি আসলে কি হচ্ছে! তবে খারাপ কিছু হচ্ছে এতোটুকু আন্দাজ করতে পেরে ডান পাশে গিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম। কিছু কিছু মানুষ হয়তো বের হয়ে গিয়েছিল। তারা বেঁচে গিয়েছিল। ঐদিন আমিও বেঁচে গেছি। আমার ডান পাশে যে ছিল সে খুব বাজে ভাবে ইঞ্জুরড হয়েছিল।এবং শেষ পর্যন্ত সে মারা গেছে। আমার পায়ের নীচে ছিল সোমালিয়ান একটা ছোট বাচ্চা ছিলো সেও মারা গেছে। যখন ফায়ার হচ্ছিল আমার বাম পাশের সোল্ডারে একটা বুলেট লাগে। বুলেট লাগার পর আমি ফিল করলাম আমি হয়তো মারা যাচ্ছি। প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মতো ফায়ারিং হয়েছিলো। এগজ্যাক্টলি সময়টা কতো ছিলো আমি মনে করতে পারছি না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি আসলে নিজেই জানিনা আমি কিভাবে বেঁচে ফিরে আসলাম। কারণ আমি ভিডিওতে পরবর্তীতে দেখছি আমার দিকে এসে তিন থেকে চারবার গুলি করছে। সৌভাগ্যবশত আমি বেঁচে গেছি।
নারকীয় ওই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন: যখন ফায়ারিং শেষ হলো আমি দুইটা ইন্ডিয়ান বন্ধুকে দেখতে পেলাম, যাদের সঙ্গে আমি আগে থাকতাম। আসিফ ভাই, উনার পড়াশোনা এখনো শেষ হয় নাই; এখনো স্টুডেন্ট, উনি আমার কাছে এসে বললেন তোমার কিছু হয় নাই; তোমার বুলেট ভেতরে যায় নাই, টাচ করে গেছে; ভেতরে হোল হয়ে গেছে। এরপর ডান থেকে বামে পেছনে তাকিয়ে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। সোমালিয়ান যে ছেলেটি, তিন থেকে চার বছর বয়সী নামাজের আগে কোরআন শরীফ পড়ছিল; সম্ভবত সে হাফেজ, সে আমার পায়ের কাছে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মুখে বুলেট লাগা, মৃত অবস্থায় পড়ে আছে আমার সঙ্গে। মোজাম্মেল(বাংলাদেশি), নামাজ শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশে যাওয়ার ব্যাপারে যার সঙ্গে কথা বলছিলাম তাকে খুঁজে পেলাম না। তখনও জানিনা তার ভাগ্য কি ঘটেছে।
যোগ করেন: আমাদের এখানকার মুসলিম কমিউনিটি খুব একটা বড় নয়। সর্বোচ্চ ৩০০ জনের মত মানুষ আমরা জুম্মার নামাজে একত্রিত হই। একজন ইন্ডিয়ান ভাইকে দেখলাম দেওয়ালে মাথা দিয়ে বসে আছেন। তারমতো জীবিত কয়েকজন কে খুঁজে পেলাম, এরপর মসজিদের পেছনে সাইট দিয়ে পার্কিং দিয়ে আমি বের আসে পাশের একটি বাসায় আশ্রয় নিলাম। যার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম তিনি সম্ভবত নিউজিল্যান্ড আর্মি কিংবা পুলিশের কোন ডক্টর ছিলেন। তিনি আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সহায়তা করেন। আমার সঙ্গে ইমারজেন্সি কিছু লোক ছিল। তাদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। অ্যাম্বুলেন্স আসার পর তাদের সেখান থেকে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি যাইনি, কারণ আমার অবস্থাটা ততো একটা ইমারজেন্সি ছিল না। আমি তাদেরকে আহতদের প্রায়োরিটি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। এদিকে আমাদের কাছে মেসেজ পাঠানো হয়েছে, আমরা যেন মুভ না করি। কারণ যারা টেরোরিস্ট তখনও ধরা পড়েনি। এরপর আমাকে সেখানেই অপেক্ষা করতে হয়। প্রায় সাড়ে সাতটার দিকে পুলিশের ভ্যান এসে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাই।
স্বঘোষিত শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ২৮ বছর বয়সী ট্যারান্ট শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের আল নূর এবং লিনউড মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর অতর্কিতে বন্দুক হামলা চালান। হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০-এ দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয় সময় রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ। আর আহত ৪৭ জনের মধ্যে দু’ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
মসজিদে নামাজ আদায় করতে গেলেও একটু দেরিতে যাওয়ায় বেঁচে যান নিউজিল্যান্ডে সফররত বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা।

শনিবার আটাশ বছর বয়সী ট্যারান্টকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে জামিন অযোগ্য পুলিশি হেফাজতে রিমান্ডের আদেশ দেন। ৫ এপ্রিল ট্যারান্টকে আবারও আদালতে হাজিরার তারিখ দেয়া হয়েছে। ততদিন তিনি পুলিশের হেফাজতেই থাকবেন।








