বিকেএসপি থেকে: বিশ্বকাপ জিতে ফেরার পর বিকেএসপিতে প্রথম পা পড়ল অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক আকবর আলীর। যেখানকার আলো-বাতাসে পেয়েছেন ক্রিকেটার হওয়ার দিশা, সেই প্রতিষ্ঠানটিতে এবার তার আগমনের উপলক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুইদিনের ম্যাচ। বিসিবি একাদশের হয়ে খেলার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বিশ্বজয়ী ৬ তরুণকে।
লাঞ্চ বিরতির সময় বিকেএসপির প্রধান ক্রিকেট কোচ মাসুদ হাসান এগিয়ে গেলেন আকবরের দিকে। জড়িয়ে নিলেন বুকে। কোচ-শিষ্যের মাঝে কথা হল কিছুক্ষণ। পরে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মাসুদ হাসান ব্যক্ত করলেন আকবরের সঙ্গে তার রসায়ন। কথায় কথায় বেরিয়ে এলো বিকেএসপি ও জুনিয়র টাইগারদের অধিনায়কের রহস্যময় ক্রিকেট মস্তিষ্কের কথা।
আপনার ছাত্রদের বিসিবি একাদশে দেখে কেমন লাগছে?
এটা তো আসলে বলার অপেক্ষা রাখে না, সকলেই আনন্দিত হবে। যে উদ্দেশ্যে কাজ করেছি সেটা এখন মাঠে গড়াচ্ছে, সবাই দেখতে পারছে। আসলে নিজের কাজের মূল্যায়নও নিজে করতে পারছি।
এবার তাদের বিকেএসপিতে আসার মধ্যে কিছুটা তফাৎ খুঁজে পান?
কোথাও ওদের খেলতে পাঠালাম বা কোথাও খেলতে গেল সেটা একরকম। নিয়মিত ট্রেনিং করাচ্ছি, দেখা হচ্ছে, সেটা একরকম। আর এখন এসেছে অন্য বেশে। চিরাচরিত বেশ যেটা ছিল সেটা আর নেই। তারা এসেছে ভিন্নভাবে (বিসিবি একাদশের হয়ে)। এখানে জাতির পূর্ণ দৃষ্টি মনে হয় তাদের দিকে রয়েছে। তার মানে এটার বিশেষত্ব তো অবশ্যই রয়েছে। সেখানে আমিও তো ব্যতিক্রম নই।
বিশ্বকাপ জিতে আসা দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ের নিয়মিত কোচ আপনি। নিশ্চয়ই এখন গর্ব হচ্ছে।
একজন কোচের সাফল্য সেখানে, নিজের সৃষ্ট বা নিজের ট্রেনড কোনোকিছু পারফর্ম করলে। তাদের খেলা পুরো দেশ উপভোগ করছে এবং ফলাফল যেটা সেটা বয়ে এনেছে। বিকেএসপির শপথ বাক্য যেটি রয়েছে, এরসঙ্গে মিলে যায়।
ওরা বিশ্বকাপ জিতবে, এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন?
এটুকু বিশ্বাস ছিল ওরা ভালো ফলাফল করবে। ভালোভাবে কোয়ালিফাই করবে, সেমিফাইনাল খেলবে। যখন দেখলাম ফাইনালে চলে গেল, তখন আমার আত্মবিশ্বাসের মাত্রাটা বেড়ে গেল, ইয়েস উই ক্যান উইন দ্য ট্রফি। তখন বোঝা গেছে যে ওদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা অনেক উঁচুতে চলে গেছে। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অনেক কাজ করেছি এখানে। এখান থেকেই তারা শিখেছে কখন আত্মবিশ্বাস উপরে ওঠে, কখন নিচে নামে, কখন মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে। আসলে কাজ করার ধরণ দেখলে বোঝা যায় কেমন করবে।

বিশ্বজয়ী অধিনায়ক আকবর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আকবর তো আকবরই। এখানে অন্যান্য কোচরাও রয়েছে। আমার বিভাগে যারা রয়েছে সকলেই তাকে আদর করে। আমি তাদের প্রধান হওয়ায় একটু বেশিই যোগাযোগ থাকে বা সব নজরে রাখতে হয়। ওর মাঝে কিছু ব্যতিক্রম তো আছেই। ওদের ব্যাচের যে সাতটা ছেলে ছিল, তাদের মধ্যে আকবর ছিল খুবই ধীরস্থির। চঞ্চল প্রকৃতির নয়। দেখতাম সববিষয় গ্রহণ করার দারুণ ক্ষমতা ওর মধ্যে। ক্রিকেট নিয়ে খুব চিন্তা করে। যখন খেলার সময়, তখন শুধু খেলা নিয়েই চিন্তা করে। যখন অন্য বিষয়, অন্য বিষয়। অনুশীলন সেশনে উপভোগ করার ব্যাপারটা অসাধারণ। বিভিন্ন পার্টি আয়োজন করা, এসব ওর মধ্যে ছিল। এরকম আয়োজন করা মানে হল সবার মাঝ থেকে কিছু একটা আদায় করে নেয়া। তখন বুঝেছি যে ভালো যোগ্যতা অধিনায়কের দায়িত্ব নেয়ার। খেলোয়াড়দের কাছ থেকে আদায় করে নেয়ার ব্যাপারটা আমরা কোচ হিসেবে করছি। সে জিনিসটা ও বের করতে পেরেছে। ওর মধ্যে এই তাগিদটা আছে সতীর্থ খেলোয়াড়দের থেকে ভালো কিছু আদায় করে নিতে হবে।
বিষয়টা বুঝতে পারা কাকে, কখন, কীভাবে খেলাতে হবে। কোথায় ফিল্ডার নিতে হবে। কখন কাকে ব্যাটিং-বোলিং করাতে হবে। বয়সভিত্তিক পর্যায়েই একটা ছেলের এরকম বলতে পারা তো বিরাট কিছু। ম্যাচ নিয়ে আমার সঙ্গে কথাবার্তা বললে দেখতাম আমি যা চিন্তা করেছি একবারে কাছাকাছি বা তারচেয়ে বেশি কিছুটা। আমি তো কোচ হিসেবে চিন্তা করি সামগ্রিক ট্রেনিং কনসেপ্ট যা রয়েছে তা কীভাবে প্রতিফলন ঘটাব। কাজে লাগাব। আকবরও একইরকম চিন্তা করে রেখেছে। সে তো ওরকম কোচদের মতো প্রশিক্ষিত না। তারপরও যখন পেরেছে তখন বুঝেছি ওর প্রতিভা সম্পর্কে। সহজাতভাবেই ওর গেমসেন্স অনেক প্রখর। আমার সঙ্গে কাজ করেছে, যেটা বুঝতে পেরেছি তার মধ্যে এমন অনেককিছু আছে যা আমিও ভাবি না। আমি চিন্তা করেছি ওদের সবাইকে কীভাবে ট্রেন-আপ করা যায়। আর ও চিন্তা করেছে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে। তখনই বুঝতে পারি, সে অসাধারণ। সাকিব আল হাসান যখন এখানে ছাত্র ছিল, তখনও তাদের গ্রুপের কোচ ছিলাম আমি। গ্রুপ ম্যাচ বা নিজেদের মধ্যে ম্যাচগুলা করতাম তখন বলতাম ট্রেনিংয়ে টেকনিক্যালি এ কাজগুলা করব। প্রচলিত ভাষায় বলে না, ‘ক’ বললে কলকাতা বুঝে যায়। অনেককে হয়তো বারবার যেটা বলা লাগত তেমনটা ওকে(আকবর) বলা লাগেনি।
আকবর তো অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ২৪ সদস্যের স্কোয়াডে ছিল না। সেখান থেকে পরে সুযোগ পেল কীভাবে?
আমি তার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। বিসিবি বা নির্বাচকদের সঙ্গে কথা বলেছি। কোনোভাবে তৈরি করা যায় কী না ওকে। সেই সুযোগটা এসে যায় যুবারা নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়ার আগে বিকেএসপিতে প্রস্তুতি ম্যাচে। এখানে ম্যাচের আয়োজন করেছিল বিসিবি। আমাদের বলা হল আমরা ম্যাচ খেলব আপনাদের দল (বিকেএসপি) তৈরি আছে কিনা? তখন ভাবলাম, এই একটা সুযোগ। আমাদের দলের অধিনায়ক থাকবে আকবর। সে ভালো পারফর্মার। আমার মোক্ষম সুযোগ আসে কায়সার আহমেদের (গেম ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, বিসিবি) সঙ্গে কথা বলার পর। উনি একবাক্যে বুঝে গেছে কী দরকার। আমি বললাম, ‘কি করতে পারি স্যার।’ উনি বললেন, ‘এটাই মোক্ষম সুযোগ। ম্যাচ খেলা লাগবে, আকবর আলীকে সুযোগ করে দিতে হবে।’ শেষে চার নম্বর মাঠে আমরা ম্যাচ আয়োজন করি। প্রথম ম্যাচে আমি এবং হান্নান সরকার (অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নির্বাচক) মাঠে ছিলাম।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলের টিম ম্যানেজমেন্টের যারা ছিল তাদের সঙ্গে কথা বললাম। হান্নানকে বললাম, ‘দেখো, আমি কোনো তদবির বা সুপারিশ করছি না, কোনো না কোনোভাবে হয়ত ভুল (আকবরের স্কোয়াডে না থাকা) হয়ে গেছে। আমার মনে হয় ও সুযোগ পেলে তোমাদের আশা পূরণ করবে। আকবরকে হারিও না।’ ছোটভাই হিসেবেই হান্নানকে বললাম।
ওই ম্যাচে আকবর ৯১ রানের ইনিংস খেলায় ড্রেসিংরুমে আমরা বসলাম। বিকেল তখন, ম্যাচ তখনো চলছে। আমাকে ডেকে হান্নান বললো, ‘ওর পাসপোর্টটা দেয়ার ব্যবস্থা করেন।’ তাৎক্ষণিকভাবে হোস্টেলে পাঠিয়ে পাসপোর্ট আনার ব্যবস্থা করি। আমি পাসপোর্ট হাতে পেয়ে চার নম্বর মাঠ থেকে দূরে অফিসে গিয়ে ফটোকপি করালাম। ‘হান্নান এই ধরো।’ ওরা তিনটা ম্যাচ খেলে চলে গেল। পরবর্তীতে দল ঘোষণার পর দেখি স্কোয়াডে আকবর আলীর নাম আছে। এরপর আমরা অনুমতি দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম। সেই শুরু, একদম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই দেশে ফিরল।
শিষ্যদের সাফল্যে নিজেকেও কি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কোচ মনে হচ্ছে?
আমিও একজন সাধারণ নাগরিক। উপলব্ধি করি এটা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। যেহেতু আমরা বেতন নিয়ে কাজ করি, এটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমাদের বেতন দেয়া হচ্ছে। আমরা কী দিচ্ছি? এই অনুভূতিটা কাজ করে বলেই কাজের টাইমের বেশি অতিরিক্ত কাজ করি আমরা। এই ছেলেদের গড়ার জন্য। সাধারণ রুটির ওয়ার্কে এমন ছেলে তৈরি করা কঠিন। নিয়মিত অনেক কাজ বাদ দিয়েও আমাদের রুটিন ওয়ার্ক করতে হয়। পারফরম্যান্স যেন আরও উপরে নেয়া যায়। নিজের গরজেই এই কাজটা আমরা করি। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও ওদের সাফল্যে গর্বিত।
আকবরের মতো সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার আরও কারা আছে বিকেএসপির এই ব্যাচে?
কোচ হিসেবে যেটা চিন্তা করি, আকবর আলী তো আছেই। যদিও সবাই আমার ছাত্র। এভাবে নাম বললে ওরা মনে করবে ‘স্যার আমার কথা বললেন না, ওর কথা বললেন।’ তারপরও আমার দেখা মতে, যতদূর জানি, আমি ট্রেনিং করাচ্ছি, আমার কাছে ভালো লাগে মাহমুদুল হাসান জয়কে। তার ভবিষ্যৎ খুবই ভালো। শামীম পাটোয়ারি আছে। বলা চলে ও অলরাউন্ড খেলে। তাকে আদর্শ পরিচর্যা ও গাইডলাইনে রাখতে হবে। পারভেজ হোসেন ইমন রয়েছে। ও ভালো, মাঝে মাঝে হয়তো একটু অস্থির হয়ে যায়। এদেরকে একটু বেশি করে যত্ন নেয়া। আমাদের যা কাজ আমরা করে দিয়েছি, এখন বিসিবি যেহেতু তাদের অভিভাবক, বিসিবিকেই এই কাজগুলো করতে হবে। আশা করবো যারা কোচ থাকবেন, তারা সেভাবেই যত্ন নেবেন।








