চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘‌অনলাইন পাড়াপড়শি’ ঘুমাবে কবে?

আমরা সম্ভবত অন্যের বিয়ের খবরে একটু বেশিই উৎসাহী। এজন্য প্রবাদও রয়েছে। সেটি হলো: যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই। এটা আগে ছিল অফলাইনে। এখন ‘অনলাইন পাড়াপড়শি’রও ঘুম নেই। নয়তো কারও বিয়ের খবরে তারা এত উৎসাহী কেন হবে? শুধু কি উৎসাহী? বরং এরচেয়েও বেশি। এই উৎসাহ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নববিবাহিত তারকা দম্পতিদের জীবন বিষিয়ে তুলছে।

জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। একজন অভিনেতা। অভিনয় দক্ষতা দিয়ে প্রায় সময়ই আলোচনায় থাকেন। তবে এবারের আলোচনা তার অভিনয়ের কারণে নয়। তৃতীয় বিয়ের ঘোষণায় এবার আলোচনায় তিনি। শুধু আলোচনা বললে কম বলা হবে। বিয়ের ঘোষণার পর নেটিজেনদের সমালোচনা ও নেতিবাচক মন্তব্যের তীরে বিদ্ধ হচ্ছেন এই অভিনেতা। এটা এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের কারও বিয়ের খবর সামনে এলেই যেন সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করতে হবে!

এই তীর এতটাই বিষাক্ত যে, বিয়ের বিষয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন অপূর্ব। ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে বললেন বিয়ের বিস্তারিত, দিলেন ব্যাখ্যাও। অপূর্ব বলেন: আমার এই নতুন জীবনের শুরুতে আপনাদের ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু আমার এবং শাম্মার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে কিছু কিছু অমূলক মন্তব্য আমার নজরে এসেছে, যা সম্পূর্ণরূপে অসত্য ও ভিত্তিহীন।

একইসাথে অপূর্ব প্রাক্তন স্ত্রী নাজিয়ার সাথে বিচ্ছেদ এবং সেসময়কার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। বলেন: আমার এবং আয়াশের মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে ২০১৯ সালে, যদিও তা গণমাধ্যমে পরে প্রকাশিত হয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবে আমরা এই বিষাদময় অধ্যায়ের পর সময় নিয়েছি, ভেবেছি এবং নিজ নিজ পরিবারের সাথে আলাপেও গিয়েছি। আমরা দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক। আমরা একজন আরেকজনের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই আমাদের নিজেদের জীবনপথ বেছে নিয়েছি।

এরপর মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেন অপূর্ব। তিনি বলেন: আমি খুবই দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি, আয়াশের মায়ের নতুন জীবনের সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই তাকে অপবাদ দিয়েছেন এই বলে যে, তিনি নাকি পরকিয়া করে বিয়ে করেছেন। আমি এটি নিশ্চিত করে বলতে চাই যে, এই ধরনের তথ্য একেবারেই মিথ্যা। অভিনেতা অপূর্ব ফেসবুকে যেভাবেই বলেন না কেন, তাতে বোঝা যায় তিনি খুব মনবেদনা থেকে এ ধরনের স্ট্যাটাস দিতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন জীবনের শুরুতে এমন পরিস্থিতি নিশ্চয়ই নববধুরও মনকষ্টের কারণ।

ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা নিলয় আলমগীরের কথাই ধরা যাক। ‘অনলাইন পাড়াপড়শি’র অতি উৎসাহী ভূমিকায় তার জীবন বলতে গেলে ওষ্ঠাগত। তিনি বিষময় জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। বলেছেন: ‘কী যে একটা সমস্যায় আছি। বিয়ে করেছি, দ্বিতীয় বিয়ে। হালাল সম্পর্ক, বৈধ সম্পর্ক। চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ তো আর করি নাই। নতুন বউ এর সাথে হাসি খুশি ছবি দিলে কমেন্ট করতেসে এত নির্লজ্জ কেন আপনি, দ্বিতীয় বিয়ে করছেন আবার বউ এর সাথে ছবি দেন। একা ছবি দিলাম তাতেও সমস্যা বিয়ের পর একা ছবি কেন। আমার বিড়াল এর সাথে ছবি দিলাম সেটাও সমস্যা। এক হাজারের ওপরে ছবি তুলেছি। গালি খাওয়ার ভয়ে পোস্ট করতে পারছি না।

বিজ্ঞাপন

এসব ‌‘অনলাইন পড়শি’রা শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এদের নিদ্রাহীনতার প্রভাব পড়ছে পাশ্ববর্তী দেশেও। ভারতীয় অভিনেত্রী শ্রাবন্তী যেন এদের দৃষ্টিতে ‘গনীমত’। তিনি ক’টা বিয়ে করলেন, কিংবা কেন বিচ্ছেদ হলো–সেসব নিয়ে চিন্তা করতে করতে পড়শিদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। শুধু ঘুম হারাম হলে সমস্যা তেমন হতো না, নিদ্রাহীনতার প্রভাব তারা ছড়িয়ে দেন অনলাইনে। নজিরবিহীন বুলিংয়ের শিকার হন টলিউডের এ অভিনেত্রী। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একবার তিনি দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতেও বাধ্য হয়েছিলেন। শ্রাবন্তীর অভিযোগের ভিত্তিতে এক অনলাইন ইভটিজার গ্রেপ্তারও হয়েছিল খুলনা থেকে।

শ্রাবন্তীর বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তখন জানিয়েছিল: হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো সেসব মেসেজে যে শুধু নায়িকাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে তা নয়, সঙ্গে ভারতকেও গালমন্দ করা হয়েছে। শুরুর দিকে অবশ্য সেই স্টকারদের পাত্তা দিতে চাননি শ্রাবন্তী। নম্বর ব্লক করে দিয়েছেন, কিন্তু একাধিক নম্বর ব্লক করলেও নিত্য নতুন নম্বর থেকে অশ্লীল মেসেজ পাঠিয়ে শ্রাবন্তীকে হেনস্তা করবার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এরপর বাংলাদেশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার মাহাবুব রহমান।

টলিউডের আরেক অভিনেত্রী নুসরাত জাহানের কথাই ধরা যাক। সম্প্রতি তিনি মা হয়েছেন। এর আগে স্বামী নিখিল জৈনের সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি বিয়ে করেননি। এখন বাঙালি পড়শিদের ঘুম নেই তার সন্তানের বাবা কে, সেই চিন্তা করে। এই নিদ্রাহীন কুচিন্তা তারা উগড়ে দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ট্রল এবং বিশ্রী মন্তব্যে সামাজিক এ অঙ্গনকে তারা অসামাজিক করে তুলছে। অথচ এসব থাকার কথা ছিল যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। নুসরাতের সন্তানের বাবা কে সেটা সে ভালোভাবেই জানে। এটা তো অন্যের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে না। সেটা তার ও তার সন্তানের ব্যাপার।

এমন উদাহরণ দিতে গেলে সৃজিত-মিথিলা, তাহসানসহ অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে। এরচেয়ে বরং ঢালিউডের চিত্রনায়িকা পরীমনির কথা বলা যেতে পারে সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। র‌্যাব পুলিশের অভিযোগ ছিল, তার বাসা থেকে মদ উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও তার আইনজীবী এবং নানা পরে বলেছিল খালি বোতল উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর থেকেই ‘জাত গেল’ অনলাইন ট্রলাররা সরব হয়েছে। আদালতে বিচারের আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রায় এসে গেল! যেন তিনি একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর চেয়েও ভয়ঙ্কর অপরাধী। সেই স্রোতে গা ভাসালো শিল্পী সমিতিও। অথচ এখন হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন কেন তাকে বারবার রিমান্ডে দেওয়া হয়েছে? অথচ এর আগেই ‘ অনলাইন বিচারক’রা রায় দিয়ে দিয়েছিলেন! পরীমনিও এদের জবাব দিয়েছেন বীরোচিত পন্থায়। জেল থেকে বের হওয়ার সময় মেহেদী রাঙা হাতে লিখেছেন: ডোন্ট লাভ মি বিচ।

এরপরও হয়তো অনলাইন পড়শিদের শিক্ষা হবে না। তবুও বলতে হয়, কারও জীবনের নতুন অধ্যায়ে শুভেচ্ছা জানাতে না পারলেও এমন কটাক্ষ করে সুখময় পরিস্থিতিকে বিষিয়ে তোলা কি নৈতিকতার মধ্যে পড়ে? নেটিজেনরা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে, এটা কোনভাবেই নীতি নৈতিকতার সাথে যায় না। তাহলে অনলাইনে কেন দিন দিন আমরা অসহনীয় হয়ে উঠছি? কেন দিন দিন অন্যকে আমরা বুলিংয়ের মাধ্যমে বিষিয়ে তুলছি? কারও জীবনে সুখকর পরিস্থিতি তৈরি করে দিতে না পারলেও আমরা যেন কারও জন্য বিষাক্ত হয়ে না উঠি। এরচেয়ে বরং নিজের ঘুমের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। এতে নিজের শরীরের পাশাপাশি সমাজও সুস্থ থাকবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে কিংবা ডলার আয়ের জন্য বাড়তি ক্লিকের আশায় দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কোনো সুযোগ গণমাধ্যমেরও নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন