চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৯০ দশকের তুলনায় আমরা খারাপ কাজ করছি না: বান্নাহ্

‘মাত্র ৩-৪ লাখ দিয়ে ৪০-৫০ মিনিটের নাটক থেকে অনেক বড় কিছু প্রত্যাশা করা মোটেও উচিত নয়’

নতুন প্রজন্মের কাছে নির্মাতা হিসেবে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন মাবরুর রশিদ বান্নাহ্। তার নির্মিত নাটকের আলাদা দর্শক সৃষ্টি হয়েছে। দর্শকদের কাছে, নির্মাতা হিসেবে বান্নাহ্ একটি ব্র্যান্ড! ইউটিউবে উৎসব ছাড়াই বান্নাহ্’র  নির্মিত নাটকগুলো উৎসবের আমেজ এনে দেয়। করোনার কারণে মাঝখানে সবার মতোই দীর্ঘ বিরতিতে ছিলেন বান্নাহ্। তবে ঈদুল আযহাকে ঘিরে আবারও কাজে ফিরেছেন এই নির্মাতা। স্বাস্থ্য বিধি মাথায় রেখে ছোট্ট টিম নিয়ে কাজ করছেন। নতুন চ্যালেঞ্জ যেন সামনে! করোনা পরিস্থিতি, সময়ের ভাবনা, পালাবদলের সম্ভাবনা- এসব নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা বলেছেন নির্মাতা:

স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুটিং সম্ভব হচ্ছে?
১১৪ দিন পর শুটিংয়ে নেমেছি। ৩ জুলাই থেকে শুটিং করছি। টিমের সদস্য কমিয়ে কাজ করছি। শুটিংয়ে যাদের না হলেই নয়, শুধু তাদের রেখেছি। যারা ইউনিটে রয়েছেন শুটিংয়ের আগে থেকে আলাদা করে রেখেছি। প্রত্যেক সদস্য পিপিইসহ মাস্ক পরছে, কিছুক্ষণ পরপর হাত পরিস্কার করছে। পরিচালক ও টিমের সচেতনার উপর সবকিছু নির্ভর করছে। তাই আমার কাছে মনে হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুটিং করা সম্ভব। অনেকগুলো কাজের প্ল্যান করে রেখেছি। এভাবে সচেতন থেকে যতদিন পর্যন্ত মনে হবে কাজ করা যাবে, ততদিন কাজ করে যাবো। নিরাপদ মনে না হলে শুটিং বন্ধ করে দেব। প্রযোজকদের সঙ্গে এভাবেই কথা হয়ে আছে। তারাও একমত হয়েছেন। পূর্ণ সচেতন থাকার পরেও যদি করোনা আক্রান্ত হই তাহলে বুঝতে হবে আমাদের কপালে ছিল। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী, ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি থেকে হলিউডের অভিনেতা, বলিউডের অমিতাভ বচ্চনের পরিবারও এ থেকে রক্ষা পাইনি। সেখানে আমার আর করার কী বা থাকে! তবে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে শুটিং করছি।

বিজ্ঞাপন

শুটিংয়ে শিল্পীদের সতঃস্ফুর্ততা কেমন দেখছেন?
আমার শুটিংয়ে শিল্পীরা খুবই সতঃস্ফুর্ত এবং সহযোগিতা পরায়ণ হয়ে কাজ করছেন। তারা চাচ্ছেনও নিরাপদ থেকে যেন নিয়মিত শুটিং হয়। শিল্পীদের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি পাইনি। আমি শুনেছি, করোনায় সচেতনতায় ঘাটতি থাকায় অনেক ইউনিটে শিল্পীরা সতঃস্ফুর্তভাবে কাজ করতে পারছে না। শিল্পীরা প্রতিবাদ করছেন। তারা পূর্ণ সচেতনা চাচ্ছেন। যেসব পরিচালক-প্রযোজক সচেতন থেকে শুটিং করছে পারছে না এটা তাদের ব্যর্থতা। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সবকিছুতে সচেতন থাকা সম্ভব। এতে করে খরচ বেড়েছে। কিন্তু আমার কাছে খরচের চেয়ে মানুষের জীবন বড়। এসব গুরুত্ব দিচ্ছি বলেই আমি শিল্পীদের সতঃস্ফুর্তভাবে পাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

আপনার পরিচালিত ‘আশ্রয়’ ব্যাপক প্রশংসিত একটি নাটক। আসন্ন ঈদে এমন ব্যতিক্রমী ধরণের কোনো কাজ দর্শক দেখতে পাবে?
আশ্রয়ের মতো বড় আয়োজনের নাটক করতে না পারলেও অন্য ব্যতিক্রমী নাটক দর্শক দেখতে পাবেন। কনসেপ্ট নিয়ে অনেক কাজ করেছি। তবে এবার করোনার মধ্যে শুটিংয়ে টিম ছোট হয়ে গেছে। এ অবস্থা আমাদের ব্র্যাকেটবন্দি করে ফেলেছে। গতবছর কোরবানির ঈদের জন্য বানিয়েছিলাম ‘আশ্রয়’। পুরো বছরের উল্লেখযোগ্য কাজ এটি। ‘আশ্রয়’ বানাতে বাজেট পেয়েছিলাম সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। কথায় বলে, যত গুড় তত মিষ্টি! সত্যি আমি একবারও ভাবিনি কত টাকা খরচ হচ্ছে। নিজের পারিশ্রমিকও যা রেখেছিলাম তা খুবই কম। শুধু একটাই জিনিস মাথায় ছিল, প্রজেক্টটা ভালো হতেই হবে। প্রযোজক আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ফলাফল পেয়েছি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। হয়তো আমার এ কাজটি ২০ বছর পরেও মানুষ মনে করবে।

এ নাটক থেকে সাতটা অ্যাওয়ার্ড এসেছে। নির্মাতা হিসেবে ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত জার্নি করে ক্যারিয়ারে প্রথম অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছি ‘আশ্রয়’ দিয়ে। এতোকিছুর পর এমন অভাবনীয় সাফল্যের কারণ, প্রযোজক বাজেটের দিকে তাকাননি। এজন্য তার কাছে কৃতজ্ঞ। দর্শক এখনও বলে আশ্রয়ের মতো কাজ কেন করছি না? উত্তর, আশ্রয়ের মতো বাজেট পাচ্ছি না। এমনকি ওই বাজেটের অর্ধেক বাজেটও পেতে হিমশিম খেতে হয়। তাহলে এমন ভালো কাজ হবে কীভাবে? আশ্রয়ের মতো বাজেট পেলে হয়তো আরও ভালো কাজ উপহার দিতে পারতাম, গ্যারান্টি।

এভারেজ নাটক প্রতি বাজেট কতো হওয়া উচিত?
প্রতি নাটকের বাজেট হওয়া উচিত ছিল ১৩-১৪-১৫ লাখ টাকা। আমরা শুনেছি, ২০-২৫ বছর আগে নাটকের বাজেট সাত-আট লাখ টাকার নিচে হতো না। এটা আমাদের কাছে রূপকথার মতো মনে হয়! তাহলে সেই সময়ে বাজেটের পরিমাণের কথা মাথায় রেখে বর্তমান সময়ে প্রতি নাটকের বাজেট ১৪-১৫ লাখ টাকা হওয়া স্বাভাবিক! কিন্তু দেয়া হচ্ছে ৩-৪ লাখ, যেটা আমার লেভেলের পরিচালকের কাছে পানি ভাতের মতো ব্যাপার। অথচ একজন নতুন নির্মাতার কাছে বাজেট পাওয়া স্বপ্নের মত, যেটা ৩ বছর আগে আমার কাছেও ছিল। মাত্র ৩-৪ লাখ দিয়ে ৪০-৫০ মিনিটের নাটক থেকে অনেক বড় কিছু প্রত্যাশা করা মোটেও উচিত নয়।

করোনায় সবকিছু ওলটপালট। এ যাত্রার ধাক্কা কাটিয়ে পরবর্তীতে নাট্যাঙ্গনে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে?
না, আমি সেভাবে কোনো পরিবর্তন আসবে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা চলমান ছিলাম। করোনা সেই গতি থামিয়ে দিয়েছে। অনেকের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝেছি, করোনা পরবর্তীতে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। আগে যা ছিল সেটাই। হয়তো আরও খারাপ কিছু হতে পারে। ভালো কোনো পরিবর্তন আসবে না এটা মনে হওয়ার কারণ, নাটক বিক্রি করতে গেলে এখনও ‘স্টার কাস্টিং’ বিক্রি করতে হয়। কিন্তু আমাদের উচিত স্টার কাস্ট নয়, গল্প বিক্রি করা। এটার সুযোগ এখনও রয়েছে। গল্প নির্ভর কটা কাজ হচ্ছে বোঝা যাবে ঈদুল আযহার নাটকগুলো দেখলে। নাটক সংস্কৃতির একটা অংশ মাত্র। আর পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে সিনেমার উপরে কিছু নেই। সিনেমায় অনেকগুলো আর্ট দেখানো যায়, কিন্তু নাটকে তা যায় না। আমাদের দেশের সিনেমা যে চিন্তায় আগাচ্ছে এই জায়গায় পরিবর্তন আনা উচিত। এখনই কনভার্ট করার সময়। এখান থেকে বের করে আনতে পারবে নতুন নির্মাতা। পুরানো নির্মাতাদের ছোট করছি না। কিন্তু নতুন নির্মাতারাই নতুন চিন্তা সাহস দিয়ে হয়তো সিনেমায় পরিবর্তন আনতে পারবেন।

কিন্তু আমাদের সিনেমার দর্শক দিনে দিনে কমে এসেছে। বরং নাটকের দর্শক বেশি! এ নিয়েই মানুষের প্রত্যাশাও বেশি দেখা যায়। তবে দর্শক ঘুরে ফিরেই ৯০ দশকের নাটকগুলোর উদাহরণ টানে। এখনকার কাজগুলোর কথা তুলে দর্শকই বলছেন, আগের মতো ভালো নাটক হচ্ছে না। এর ব্যাখ্যা জানতে চাই…
নাটক নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা বেশি কারণ এখানে সেরা অভিনেতা অভিনেত্রীরা, নির্মাতারা কাজ করেন। কিন্তু নাটক থেকে এত প্রত্যাশা করাটা অন্যায়। নাটক বানানোর জন্য যে বাজেট দেয়া হয়, সেটা মোটেও যথেষ্ঠ নয়। আমিও শুনি, অনেকেই বলে আগের মতো নাটক হয়না! এর ব্যাখ্যাটা তাহলে দেই, ধরে নেই ৯০ দশকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে নাটক প্রচার হতো। ধরে নিলাম বছরে ৫২ টা নাটক নির্মিত হতো এবং ১০ বছরে গড়ে ৫০০ নাটক হয়েছে। বোদ্ধারা এই ৫০০ থেকে ৫০-৬০ টি ভালো নাটকের নাম বলুক। ২-৩ জনের উত্তর নেব না। কারণ ২-৩ জন দিয়ে দুনিয়া চলে না। যতগুলো মানুষ বলে আমাদের নাটক হচ্ছে না ততগুলো মানুষকে ৫০-৬০ টি নাটকের নাম বলতে হবে। আমি জানি ১০-১৫ টার বেশি নাম বলতে পারবেন না। তারমানে ৯০ দশকেও ১০-১৫ পারসেন্ট ভালো নাটক হতো। এখন ১৫-২০ পারসেন্ট নাটকই ভালো হয়। ঈদেই ২০ পারসেন্ট নাটক দর্শকের ভালো লাগে। তাই আমরা ৯০ দশকের তুলনায় খারাপ কাজ করছি না। হয়তো কিছু কিছু কাজ ৯০ এর তুলনায় আরও ভালো হচ্ছে। সেই সময়ের ঘুরে ফিরেই আসবে সংশপ্তক, বহুব্রীহি, আজ রবিবার, এইসব দিনরাত্রিসহ হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদুল্লাহ কায়সার, সেলিম আল দীন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইমদাদুল হক মিলনের নাটকের নাম। আমরা এখন ফাইট করছি নেটফ্লিক্স অ্যামাজন প্রাইম এর সঙ্গে। তাদের একটি কনটেন্ট এর বাজেট থাকে কয়েক মিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় কি আমাদের নাটকের বাজেট দেয়া হয়? বাজেট যেখানে দেয়া হয় না সেখানে ভালো কাজ আশা করে কীভাবে? পৃথিবীর প্রায় সবখানের ভালো কাজের সংখ্যা ১০-১৫ পার্সেন্ট। হলিউড-বলিউডে বছরে যতগুলো সিনেমা নির্মিত হয় সব তুলনা করলে বছরে ১০-১৫ পারসেন্ট ভালো কাজ হয়। কথায় কথায় পৃথিবীর উদাহরণ টেনে নেয়া হয় তাহলে সেই তুলনায় আমাদের বাজেট দেয়া হয়না কেন? এছাড়াও আমাদের নির্মাতাদের নানারকম সীমাবদ্ধতা মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। নির্মাতারা চাইলেও যে কোন গল্প নিয়ে কাজ করতে পারে না। আমি যদি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বা এরশাদ শিকদারের জীবনী নিয়ে ওয়েব সিরিজ বানাইতে চাই সেটা হয়তো বাঁধা আসবে। কিন্তু তাদের প্রকৃত জীবনী নিয়ে অসাধারণ কনটেন্ট নির্মাণ সম্ভব। যদি ঠিক ভাবে বানানো যায়, তাহলে সারা দুনিয়ার মানুষ দেখে অবাক হয়ে দেখবে। ফারুকী ভাই আমাদের দেশের একটি ঘটনা নিয়ে একটি সিনেমা বানিয়েছেন, এতে করে উনি কম অসুবিধা পোহাচ্ছেন? নির্মাতাদের স্বাধীনতা দেয়া উচিত। তার যেকোনো গল্প নিয়ে কাজের অধিকার রাখবে। তাই বলে আমি অশ্লীলতার পক্ষে বলছি না। শুধু শুধু নির্মাতা শিল্পীদের দোষ দেয়ার আগে এসব ভেবে কথা উচিত।

মনে হচ্ছে অনলাইনে বিভিন্ন মন্তব্য নির্মাতা হিসেবে আপনাকে বেশি প্রভাবিত করে?
আমি তো আগেই বলেছি আমাদের কাছে বেশি কিছু প্রত্যাশা রাখা হয় সেটা একপ্রকার অন্যায়। দুএকটা কনটেন্ট খারাপ হলেই নির্মাতা শিল্পীদের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে বা ইউটিউব কমেন্টসে নাম ধরে যেভাবে মন্তব্য দেখা যায়, মনে হয় আমরা দেশের হাজার কোটি টাকা চুরি করেছি। অথচ আমাদের দেশে নাটক সিনেমা দুএকটা খারাপ হলেও দেশের আলোচ্য বিষয় না। আলোচ্য বিষয় হচ্ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সড়ক ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, হাসপাতাল, অক্সিজেন, এম্বুলেন্স, চুরি, দুর্নীতি এসব। এ নিয়ে সিরিয়াস হয়ে কথা বলতে দেখিনা। যতদোষ নাটক-সিনেমায়! যারা দেশ থেকে হাজার কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করছে তাদের তুলনায় আমরা কি বেশি অন্যায় করছি? আমরা কি দেশের জন্য তাদের থেকেও বেশি ক্ষতিকর? এসব দেখলে আমার মেজাজ খারাপ হয়। কারণ, যে লোকটা দেশের বারোটা বাজাচ্ছে ক্ষতি করছে তার তুলনায় আমাদেরটা আদৌ অন্যায়? তবে বৃহৎ শ্রেণির মানুষ অবশ্যই আমাদের পছন্দ করেন। পছন্দ না করলে আমরা তো এখানে কাজ করতে পারতাম না। ওই মানুষগুলোকে জানাই স্যালুট।