চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৭১ এর যোদ্ধা নারীরা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশ বাঙালি জাতির এমন এক ইতিহাস, যেখানে লাল সবুজ পতাকাতে লুকিয়ে আছে লক্ষ নারীর ত্যাগ তিতীক্ষার কথা। এদেশের ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে আছে লক্ষ নারীর সম্ভ্রম হারানোর ইতিহাস।

নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হায়েনা আর দেশিয় রাজাকাররা মা বোনদের ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে। তাদের ভ্রুণে জন্ম নিয়েছে অনেক যুদ্ধ শিশু। অনেক নারী যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিনাদোষে হয়েছে পরিবার হারা। অনেক যুদ্ধ শিশু আজ অবধি জানে না কে তার জন্মদাত্রী মা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। চারদিকে বিজয়ের উল্লাস। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দেশে এসে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। দেশের মানুষের জন্য তিনি শুরু করলেন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। যেখানে তিনি নারী পুরুষের সমতাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সবার আগে।

বঙ্গবন্ধু নারীদেরকে সব সময় সম্মান দিয়েছেন। যার প্রমাণ মিলে সংগ্রামী জীবনের চিরসাথী স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রতি তার প্রেম, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর কর্তব্যনিষ্ঠা থেকে। তিনি সব বিষয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছার মতামত নিতেন।

এমন মহৎ মনের মানুষটি কখনো নির্যাতিত নারী শব্দটি উচ্চারণ করতেন না। যা তার ‘অসমাপ্ত জীবনী বইটি পড়লে জানা যায়।

মুক্তিযুদ্ধ বাংলার নারীদের ত্যাগ যে কোনো কিছু দিয়ে শোধ হবে না, তা তিনি বারবার বলেছেন।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অত্যাচারিত নারীরা এ সমাজে যখন নিগৃহীত নিপীড়িত হতে থাকে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সত্যিকারের পিতার ভূমিকায় থেকে বলেছেন ” ধর্ষিতা মেয়ের বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও। আর ঠিকানা লেখ ধানমণ্ডি ৩২…। মুক্তিযুদ্ধে আমার মেয়েরা যা দিয়েছে সেই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব?”

যে নারীদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো, তাদের যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি পাবনার বেড়া উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে যান বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করতে। সে অনুষ্ঠানে কয়েকজন নারী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তারা যুদ্ধকালীন সময়ে কিভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন সে সব ভয়ঙ্কর সব ঘটনার কথা বলেন। কথাগুলো শুনে বঙ্গবন্ধুর চোখে জল চলে আসে। বঙ্গবন্ধু তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেন। তারপর বাঁধ নির্মাণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, “আজ থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা নির্যাতিতা মহিলারা সাধারণ মহিলা নয়, তারা এখন থেকে ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত। কেননা দেশের জন্যই তারা ইজ্জত দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে তাদের অবদান কম নয় বরং কয়েক ধাপ উপরে, যা আপনারা সবাই জানেন, বুঝিয়ে বলতে হবে না। তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে এবং যথারীতি সম্মান দেখাতে হবে। আর সেই সব স্বামী বা পিতাদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি যে, আপনারাও ধন্য। কেননা এ ধরনের ত্যাগী ও মহৎ স্ত্রীর স্বামী বা পিতা হয়েছেন। তোমরা বীরাঙ্গনা, তোমরা আমাদের মা।”

এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের বীর নারীদের বঙ্গবন্ধু যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছেন। তাদের জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিক (১৯৭৩-১৯৭৮) পরিকল্পনায় স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

১৯৭২ সালে দেশে যুদ্ধ শিশু নিয়ে প্রশ্ন উঠে পরিবার সমাজে। এদের মেনে নেয়ার মত মানসিকতা ছিল না মানুষের। কিন্তু এ শিশুরা বীরাঙ্গনাদের সন্তান এমন উপলদ্ধি থেকেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ” যেসব শিশু জন্মাবে তাদের জন্মাতে দাও। অনেক দম্পতি সন্তানের জন্য হাহাকার করে। তাদের সেই শিশুদের দেয়া যেতে পারে।” তিনি সে সময় বিদেশে যুদ্ধশিশুদের দত্তকের ব্যবস্থা করেন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল আইনের। তিনি আন্তর্জাতিক শিশু দত্তক আইন এবং গর্ভপাত আইন নামে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেন।

বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা। যার মাধ্যমে ৭১ সালের নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুদের পুনর্বাসন এবং আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর রিহ্যাবিলিটেশন, মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির মাধ্যমে বহু যুদ্ধশিশুকে বিদেশে দত্তক দেয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দত্তক হয়নি এমন শিশুদের বিভিন্ন শিশুসদনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এমন মহৎ কাজের পেছনে একমাত্র অবদান ছিল বঙ্গবন্ধুর।

একজন পিতা যে, কন্যার সুখ-দুঃখে পাশে থাকে তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধু। তিনি ৭১ ‘এর মুক্তিযোদ্ধাদের বীর শ্রেষ্ঠ, বীর প্রতীক খেতাব দেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা নারীদের জন্য দিয়েছেন বীরাঙ্গনা খেতাব। তার এ উচ্চমার্গীয় চিন্তার কাছে শ্রদ্ধায় অবনত হয় দেশ ও জাতি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)