চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৫০ বছরে চেতনার বাতিঘর রমনা বটমূল

এবারের পহেলা বৈশাখে পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করছে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব। তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় বটমূলে বর্ষবরণ হয়নি বলে এবারের আয়োজন ৪৯তম। ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে প্রথমবারের মতো বর্ষবরণ করেছিলো ছায়ানট।

বাঙালি চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছায়ানটের মূল অনুষ্ঠানই আসলে রমনার বটমূলে বৈশাখের প্রথম প্রত্যূষে বাংলা নববর্ষের আবাহন। ছায়ানটের গণ্ডি ছাড়িয়ে এটি এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত।

ইতিহাস বলছে, প্রথম অনুষ্ঠানটি হয়েছিলো রাজধানীর রমনা উদ্যানে পঞ্চবটীর নিচে ১৩৭৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাতে যা ছিলো ১৯৬৭ সালের মধ্য এপ্রিল। পঞ্চবটী বলতে অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকি ও অশোক বোঝায়। ভালো শোনায় বলে অনুষ্ঠানস্থলের নাম করা হয় বটমূল।

ছায়ানটের সংগঠকরা জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই সুরের মূর্চ্ছনা আর কথামালায় রমনা বটমূলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে।

যেভাবে শুরু
প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: কর আদায়ে সমস্যা দূর করতে পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন শুরু করেন মুঘল
সম্রাট আকবর। তখন থেকে পালিত হয়ে আসলেও ষাটের দশকে এটি ভিন্ন মোড় নেয়।

‘সেসময়ের পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক আগ্র‍াসনের বিরুদ্ধে
১৯৬৭ সালে প্রতিবাদের অনন্য ভাষা হিসেবে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন
শুরু করে ছায়ানট। তখন থেকে বাঙালির চেতনার আরেক বাতিঘর তাই রমনা বটমূল,’ বলে মন্তব্য করেন এ ইতিহাসবিদ।

যেভাবে ছায়ানটের জন্ম
তার আগে বাংলা ১৩৬৮, ইংরেজি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রশতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসনের থমথমে পরিবেশেও কিছু বাঙালি এক হয়েছিলেন আপন সংস্কৃতির মধ্যমণি রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষপূর্তির উৎসব করবার জন্যে।

বিজ্ঞাপন

ছায়ানট তার পরিচিতিতে বলেছে: তমসাচ্ছন্ন পাকিস্তানি যুগে কঠোর সামরিক শাসনে পদানত স্বদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্রভাবনা অবলম্বন করে ছায়ানট যাত্রা শুরু করে। সারাবিশ্বে শতবার্ষিকীর আয়োজন বাংলার এই প্রান্তের সংস্কৃতিসচেতন মানুষের মনেও চাঞ্চল্য জাগায়। বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদ, ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ বুদ্ধিজীবী যেমন উদ্যোগী হলেন- তেমনি ঢাকার কিছু সংস্কৃতিকর্মীও আগুয়ান হলো শতবর্ষ উদযাপনের উদ্দেশ্যে। অগ্রাহ্য হলো অনতিউচ্চারিত নিষেধ। সংস্কৃতি-প্রাণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস এনে দেয় রবীন্দ্রশতবার্ষিকীর সফল উদ্যোগ।

‘শতবার্ষিকী উদযাপন করবার পর এক বনভোজনে গিয়ে সুফিয়া কামাল, মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই), সায়েরা আহমদ, শামসুন্নাহার রহমান (রোজ বু), আহমেদুর রহমান (ইত্তেফাকের ‘ভীমরুল’), ওয়াহিদুল হক, সাইদুল হাসান, ফরিদা হাসান, সন্‌জীদা খাতুন, মীজানুর রহমান (ছানা), সাইফউদ্দীন আহমেদ মানিকসহ বহু অনুপ্রাণিত কর্মী সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্যে সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। জন্ম হয় ছায়ানটের।’

ছায়ানটের এখনকার সভাপতি সনজীদা খাতুন।

বিশ্বসভায় বাঙালির পরিচয় পহেলা বৈশাখ
অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, পহেলা বৈশাখ উদযাপন এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, নানা রঙের ছটায় পুরো বাংলাকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ারও প্রতিক পহেলা বৈশাখ।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, এই নববর্ষ উদযাপন কবে শুরু হয়েছিলো তা মুখ্য নয়। বরং দীর্ঘ দিন উদযাপিত হয়ে এটি যে এখন বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটাই মূল বিষয়।

মুনতাসীর মামুনের মতে, পহেলা বৈশাখ এখন আর শধু কোনো আনন্দ অনুষ্ঠান নয়, প্রয়োজনে এটি বাঙালির প্রতিবাদেরও মোক্ষম ভাষা।

তিনি বলেন, আজ নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। বাঙালির একমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান হচ্ছে পহেলা বৈশাখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন,  বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বাঙালি-চাকমা একই দিনে একই চেতনা নিয়ে নতুন বর্ষকে বরণ করে নেয়।

বিজ্ঞাপন