চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৩৫তম বিসিএস পুলিশের শ্রেষ্ঠ ৩ কর্মকর্তার গল্প

সারদা পুলিশ একাডেমির মাঠে সুসজ্জিত ১২৩ জন শিক্ষানবিশ পুলিশ কর্মকর্তা। তাদের অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীর জন্য। অপেক্ষমান চোখগুলোর দৃষ্টি তখন আকাশের দিকে। এরই মাঝে সারদার আকাশে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টার। এসময় উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তারা। 

এইতো সেই মাহেদ্রক্ষণ। যার অপেক্ষা তাদের দীর্ঘদিনের। প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানাবেন তারা। শপথ নেবেন আগামীর পথচলার।

বিজ্ঞাপন

৩৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৭ সালের ১০মে বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ নিতে সারদা এসেছিলেন এই কর্মকর্তারা। তার শেষ হয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গত ১৬ মে সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে।

প্রশিক্ষণ শেষে এই নব্য পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বপ্নাতুর চোখে এখন একটাই স্বপ্ন, নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করা। চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শ্রেষ্ঠ তিন শিক্ষানবিশ সহকারি পুলিশ সুপার জানিয়েছেন তাদের অনুভূতি আর আগামীদিনের স্বপ্নের কথা।

গত এক বছরের কঠোর এ প্রশিক্ষণের মূলমন্ত্রই ছিল শৃঙ্খলা। এ প্রশিক্ষণ শেষে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক বেশি ক্লান্ত হলেও সারদা পুলিশ একাডেমি ছাড়ার মূহুর্তটা ছিল বেদনাদায়ক। গত এক বছরের সার্বক্ষণিক সঙ্গী প্রিয় ব্যাচমেটদের ছেড়ে যেতে দু:খ ভারাক্রান্ত হয়েছে হৃদয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন দায়িত্বটাই তাদের কাছে বড়।

বেস্ট প্রবিশনার মো: মাহবুব হাসান
ছোট থেকে পুলিশ দেখে ভয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়া ছেলেটিই আজ পুলিশের কর্মকর্তা। ৩৫তম বিসিএস পুলিশের প্রশিক্ষণ শেষে ‘বেস্ট প্রবিশনার অ্যাওয়ার্ড’ (শ্রেষ্ঠ অফিসার পুরস্কার) পেয়েছেন তিনি।

ফরিদপুর থেকে স্কুল-কলেজ সম্পন্ন করার পর আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করেন। তবে চিকিৎসক থেকে পুলিশ হবার বিষয়টিকে মোটেও বিচ্ছিন্ন মনে করেন না তিনি।

দুটোতেই জনগণের সেবা দেয়ার সুযোগ আছে উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা বলেন: ‘পুলিশ হলো সামাজের ডাক্তার। পুলিশ সরাসরিভাবে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারে।’

তবে পুলিশ হলেও সারদার ট্রেনিং একাডেমির মাঠে তার চিকিৎসা বিদ্যা কাজে লেগেছে বেশ। ট্রেনিং চলাকালে আহত ব্যাচমেটদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন মাহবুবই। আর তাই জাতিসংঘ মিশনসহ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকেন না কেন নিজের চিকিৎসা বিদ্যাকে কাজে লাগাতে চান তিনি।

দীর্ঘ এক বছরের ট্রেনিং পিরিয়ড শেষে সারদা পুলিশ একাডেমি ছেড়ে আসার অনুভূতিটাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথেই তুলনা করেন তিনি।

ফরিদপুরে বেড়ে ওঠা ছেলেটির ছোট বেলায় পুলিশের প্রতি একটা ভীতি কাজ করলেও এখন তিনিই স্বপ্ন দেখেন এক মানবিক বাংলাদেশের। যেখানে প্রতিটা পেশার মানুষ মানবিকতার সাথে সেবা প্রদান করবে।

বিজ্ঞাপন

আর এ লক্ষ্যে ভুক্তভোগি মানুষের অবস্থানে নিজেকে রেখে জনগণের সেবা দিতে চান নব্য এ ‍পুলিশ কর্মকর্তা।

বেস্ট অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত আসমা আক্তার সোনিয়া
বেস্ট অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন এ কর্মকর্তা। আর এজন্য তার প্রচেষ্টা ও আকাঙ্ক্ষার কোন কমতি ছিল না। স্বপ্ন দেখতেন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নেয়ার। আর এ সাফল্যের পর স্বপ্ন যখন বাস্তবে রুপ নিয়েছে তখন তিনি আবেগাপ্লুত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সোনিয়া ঝালকাঠির মেয়ে। বর্তমানে ফিল্ড অ্যাটাচমেন্টে রয়েছেন খুলনা জেলায়। স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ যেমন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে ঠিক তেমনি একদিন উন্নত দেশের মর্যাদা পাবে। সেক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান যেমন উল্লেখযোগ্য ছিলো, ঠিক তেমনিভাবে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশ পুলিশের অবদান সবচেয়ে বেশি থাকবে।

তিনি মনে করেন, পুলিশ জনগণকে সেবা দেয়ার এমন একটা মাধ্যম যেখানে তৃণমূল পর্যায় থেকে সমাজের সর্বোচ্চ অবস্থানে অবস্থানরতদের সহায়তা দেয়া যায়।

একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আসমা আক্তার সোনিয়া অনগ্রসর নারীদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করতে চান। সোনিয়া বিশ্বাস করেন, মেয়েরা যতো বেশি উচ্চশিক্ষার সিঁড়িতে পা দেবে ততোই তারা স্বাবলম্বী হবে। আত্মমর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে পারবে সুন্দরভাবে।

প্যারেড কমান্ডার মো: মাসুদ রানা
দীর্ঘ ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন স্বরুপ প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের গৌরব অর্জন করেছেন পুলিশের এ শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা।

পুলিশে কাজ করার আগ্রহটা ছিল দীর্ঘদিনের। আর তাই সুযোগ পেয়ে সম্মানজনক এ অবস্থানে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরে গর্বিত মাসুদ রানা। বরিশালের ছেলে মাসুদ রানা লেখাপড়া করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১২৩ জন শিক্ষানবিশ পুলিশ অফিসারের মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করে প্যারেড কমান্ডার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। তবে সেদিন সারদা পুলিশ একাডেমির আবহাওয়া কিছুক্ষণের জন্য হলেও মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এ কর্মকর্তার। আকাশে মেঘ দেখে ভেবেছিলেন শেষ পর্যন্ত আসতে পারবেন তো প্রধানমন্ত্রী। বুকের ভেতর লালিত প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দেয়ার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে তো?

তবে সব শঙ্কাকে জয় করে পূরণ হয়েছে মাসুদ রানার স্বপ্ন। আর তাই সারদা পুলিশ একডেমির মাঠের আকাশে যখন প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি দেখতে পান তখনিই খুশিতে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে প্রাণ। বুঝতে আর বাকি থাকে না সারা বছরের অপেক্ষার সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত খুব কাছে।

পাসিং আউটের পর বর্তমানে ছয় মাসের ফিল্ড অ্যাটাচমেন্টে রয়েছেন দিনাজপুর জেলায়। ভুক্তভোগি মানুষের অবস্থানে নিজেকে রেখে সেবা দিতে চান নব্য এ পুলিশ কর্মকর্তা।

মাসুদ রানা স্বপ্ন দেখেন সুখি, সমৃদ্ধ, শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশের। যেখানে সব মানুষের ভাবনায় থাকবে দিনে-রাতে যেখানেই আমি থাকি সেখানেই আমি নিরাপদ। এ লক্ষ্যেই কাজ করতে চান তিনি।

Bellow Post-Green View