চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

১৫ আগস্টের খুনীরা পুরস্কৃত, প্রতিবাদকারীরা তিরস্কৃত কেন?

আসছে ১৫ আগস্ট৷ ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়৷ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা বিভিন্ন সময় নানা পদ পদবীতে পুরস্কৃত হয়৷ আর যারা রাজনৈতিক ভাবে এর সাথে যুক্ত ছিল তারাও মূল্যায়িত হয় বিভিন্ন ভাবে৷ তাদের কেউ কেউ ঠাঁই করে নেয় মোশতাক মন্ত্রীসভায়,কেউ জিয়ার মন্ত্রীসভায়,কেউ এরশাদের৷ খুনিদেরকে রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ করে দেয়া হয় ও পুরস্কার স্বরূপ সে দলকে নিবন্ধনও দেয়া হয়৷ ‘দুঃশাসনের ১৩৩৮ রজনী’ নামের বই প্রকাশ করে তাদের খুনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনেরও সুযোগ করে দেয়া হয়৷ খুনীরা প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুকে খুনের কথা বলে বেড়াতো ও এ নিয়ে তারা গর্ব করতো৷ খুনীরা দৈনিক মিল্লাত নামের একটি পত্রিকাও বের করতো তাদের মুখপত্র হিসাবে৷

১৫ আগস্টের এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ১২ জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। লেঃ কর্নেল শরিফুল হক (ডালিম)কে চীনে প্রথম সচিব হিসাবে নিযুক্ত করা হয়৷ লে. কর্নেল আজিজ পাশাকে প্রথম সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় আর্জেন্টিনায়৷ মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রথম সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় আলজেরিয়ায়৷ খুনি মেজর বজলুল হুদাকে দ্বিতীয় সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় পাকিস্তানে৷ আরেক খুনি মেজর শাহরিয়ার রশিদকে দ্বিতীয় সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় ইন্দোনেশিয়ায়৷ মেজর রাশেদ চৌধুরীকে দ্বিতীয় সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় সৌদি আরবে ও ৯১ সালে তাকে জাপানের ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবেও নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়৷এছাড়াও মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানের দ্বিতীয় সচিব,মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতের দ্বিতীয় সচিব ও কর্নেল কিসমত হাশেমকে আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়৷ লে. খায়রুজ্জামানকে তৃতীয় সচিব করা হয় মিসরে ও লেঃ. নাজমুল হোসেনকে তৃতীয় সচিব করা হয় কানাডায়৷ আরেক খুনি লে. আবদুল মাজেদকে তৃতীয় সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় সেনেগালে৷

বিজ্ঞাপন

এভাবেই বিভিন্ন স্থানে খুনিদের পদায়ন করে প্রতিষ্ঠিত করা হয়৷ আরও দেয়া হয় আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা৷ দেয়া হয় রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ৷দেয়া হয় পত্রিকা প্রকাশের সুযোগ৷ দলকে নিবন্ধন দেয়া হয়৷ কুড়ালকে তাদের দলীয় প্রতীক দেয়া হয়৷ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স করে এ হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে রহিত করে বৈধতা দেয়া হয় এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে৷

যারা স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করলো তারাই তাদের দলের নাম দিলো ফ্রিডম পার্টি৷ ১৯৮৭ সালের ৩ আগস্ট দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়৷ দলটির মতাদর্শ হিসাবে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী সমাজতন্ত্র৷ দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান করা হয় সৈয়দ তারিক রহমান ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় ডিএইচএম ইসমাঈলকে৷ প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে উল্লেখ করা হয় সৈয়দ ফারুক রহমানকে৷ দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েই শুরু করে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড৷ ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট দিবাগত মধ্যরাতে এই ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়৷ বাড়িটিকে লক্ষ্য করে তারা অনবরত গুলি ছুঁড়তে থাকে৷ আত্মস্বীকৃত এই খুনিদের এমন একটি সন্ত্রাস নির্ভর দলকে কেন ও কী উদ্দেশ্যে নিবন্ধন দেয়া হল?

বিজ্ঞাপন

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷ এ নির্বাচনেও অংশ নেয় ফ্রিডম পার্টি৷ ১ টি আসনে জিতে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি লেঃ কর্নেল ফারুক রহমান৷ উল্লেখ্য আওয়ামী লীগ, বামপন্থী সহ অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল৷ এ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল মাত্র ২১%৷ বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭৮ টি আসনে জয়লাভ করে৷ ফ্রিডম পার্টি ১ টি আসনে ও স্বতন্ত্র ১০ টি আসনে জয়লাভ করে৷ ১০ টি আসনের ফলাফল অসমাপ্ত থাকে ও ১টি আসনের নির্বাচন আদালতের রায়ে স্থগিত থাকে৷ ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়৷ ২৫ মার্চ পর্যন্ত চার কার্যদিবস পর্যন্ত তা চলছিলো৷ ৩০ মার্চ সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়৷ এ সংসদ স্থায়ী ছিল মাত্র ১২ দিন৷ আর এর বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন লেঃ কর্নেল ফারুক রহমান৷ বঙ্গবন্ধুর খুনীরা এভাবেই বারবার বিভিন্ন ভাবে পুরস্কৃত হয়ে যায়৷ আর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারীরা হতে থাকে তিরস্কৃত ও ধিকৃত৷

১৫ আগস্ট আসে যায়৷ কেবল সংবাদ পত্রে লেখালেখি হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারীদের নিয়ে৷ প্রশ্ন তোলা হয় কেন তাদের আজও মূল্যায়ন করা হচ্ছে না? যাদের সাহসিকতায় ১৫ আগস্ট গর্বিত৷ যাদের আত্মদানে বাঙালীর কলঙ্ক কিছুটা হলেও দূরীভূত হয়েছে৷ যে মানুষটি পাগলের মত ভালবাসতো ও বিশ্বাস করতো এদেশের মানুষকে৷ খুনি ও দুষ্কৃতিকারীদের আঁতাত নির্মমভাবে সে বিশ্বাসের উপরই আঘাত করলো৷ সে সময় সারাদেশ আতঙ্কে চুপসে গিয়েছিল৷ পুলিশ,সেনাবাহিনী সবই ছিল খুনীদের দখলে৷ বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী মোশতাক হয়ে গেল খুনী সরকারের প্রধান৷ এরপর ক্ষমতা চলে গেলেও তিনি বহাল তবিয়তে ছিলেন রাষ্ট্রীয় সেল্টারে৷ ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিলেন তিনি৷ তার কোন বিচার হয়নি৷ স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তার৷

ইতিহাসের জঘন্য অস্বাভাবিক ঘটনার ক্ষেত্র সৃষ্টিকারী মোশতাকসহ আরও অনেককেই কোন বিচারের মুখোমুখি হতে হলো না৷ এই খুনীকে পুরস্কৃত করা হলো রাষ্ট্রপতি বানিয়ে৷ তাকে পুরস্কৃত করা হলো রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ করে দিয়ে৷ কর্নেল (অবঃ)ফারুককে পুরস্কৃত করা হলো সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতা বানিয়ে৷ তাকেও পুরস্কৃত করা হলো রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ করে দিয়ে ও সে দলটিকে নিবন্ধন দিয়ে৷ খুনী বিপথগামী সেনা অফিসারদের পুরস্কৃত করা হলো পদোন্নতি দিয়ে ও বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে৷ আর এই খুনের প্রতিবাদকারীরা হলো তিরস্কৃত৷ রেডিও টিভি ও সংবাদ মাধ্যমে তাদেরকে প্রচার করা হতো দুষ্কৃতিকারী হিসাবে৷ যারা প্রাণ দিলো তারাও পেলোনা শহীদের সম্মান৷ পেলোনা কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান ও তাদের প্রতিবাদের স্বীকৃতি৷ আজও তারা অস্বীকৃতিতে,অনাদরে ও অবহেলাতেই রয়ে গেছে৷ কেন ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে এসব বীর প্রতিবাদকারীদের মূল্যায়িত করা হচ্ছেনা?দেয়া হচ্ছেনা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি৷ অন্যায্যতার বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রুখে দাঁড়িয়ে পুরস্কৃত না হয়ে তিরস্কৃত হলে প্রজন্ম কি আর এভাবে রুখতে চাইবে কোনদিন?মন্দ কাজ করে পুরস্কার পাবে আর ভালকাজ করে পাবে তিরস্কার এমনটি হতে পারে না৷ আর এমন হতে থাকলে কি আর ভবিষ্যতে কেউ ভালকাজ করতে জীবনের ঝুঁকি নেবে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)