চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনে ফল বিপর্যয়ের কারণ কী?

১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মাঝে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। কারণ, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রার্থী। বিষয়টিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সাথে এনটিআরসিএ’র প্রহসন বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান বলছেন: আমাদের স্ট্যান্ডার্ড এখন আগের থেকে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বেশি ফল বিপর্যয় দেখা গেছে কলেজ পর্যায়ে। সেখানে প্রায় ৯৩ হাজার পরিক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১৬০৭ জন।

এনটিআরসিএ’র বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেছে: শূন্য পদের তালিকা এবং কোন উপজেলায় কোন বিষয়ে শূন্য পদের সংখ্যা কত, সেসব বিষয় না উল্লেখ করেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া ফলাফলে নেই কোন সাবজেক্টে কতজন পাস করেছেন, তার কোনো সংখ্যা। এমনকি যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন ঠিক কত নম্বর পেয়ে সেই বিষয় নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, ১০০ নম্বরের উত্তর দিয়ে গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতিসহ অন্যান্য বিষয়ে ৮০-৮৫ নম্বর পাওয়ার আশা করলেও কৃতকার্য হতে পারেননি তারা।

১১তম ও ১২তম নিবন্ধনে পাস করা অনেকে মানোন্নয়নের জন্য অংশ নিয়েছিলেন এ পরীক্ষায়, তাদের অনেকেও কৃতকার্য হতে পারেনননি বলে জানা গেছে। এমনকি এনটিআরসিএ সনদপ্রাপ্ত যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন কলেজে কর্মরত রয়েছেন তাদের মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছেন অনেকে। ৪ বছর অনার্স ও এক বছর মাস্টার্স করে এবং দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি পেয়ে পাশ করার পরও এ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হবার বিষয়টি বোধগম্য নয় অনেকের।

এমন প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ ফল সংশোধন করে তা পুনরায় প্রকাশেরও দাবি করেছেন।

১২তম নিবন্ধনে পাস করে বর্তমানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আরিফুল ইসলাম। এই শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন: অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খাতা দেখলেও কমপক্ষে ৭৫ পাব। তারা আমাকে কোন নীতিতে ফেল করালো, স্পষ্ট করতে হবে।

তানজীলা খাতুন নামে আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন: পরীক্ষা দিয়ে ভেবেছিলাম মেধা তালিকায় ভালো অবস্থানে থাকবো। সেখানে কী করে ফেল করি। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কলেজ পর্যায়ে পাশের হার ১.৭৪% এই তামাশার মানে কী? তাও আবার এনটিআরসি এর মতো পরীক্ষায়। যেখানে বিগত পরীক্ষাগুলোতে ৪০% মার্কসেই পাশ করিয়েছে। হয়তো এই পাস সার্টিফিকেট দিয়ে (৪০% মার্কস) চাকরি হবে না কিন্তু অনেক কলেজে অ্যাপ্লিকেশন এর জন্য এনটিআরসিএ পাস সার্টিফিকেট চায়। সেখানে তো অন্তত হেল্প হতো।

তিনি বলেন: আগের নিয়ম পরিবর্তন করে থাকলেও কেনো সেটা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে নাই। আর পোস্ট খালি না থাকলে কেন এভাবে পরপর সার্কুলার দেয়।

এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মো: আব্দুল মাজিদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেছেন: খাতা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেওয়া হোক। আমার পঠিত বিষয় ছিলো ইংরেজি। সেখানে কমপক্ষে ৭৫ নম্বর পাবো এমনটাই আশা ছিলো। অথচ আমি অকৃতকার্য হয়েছি। কোন সাবজেক্টে কতজন পাশ করলো কিছুই উল্লেখ নেই ফলাফলে। কোনটাতে কত শূন্য পদ ছিলো তাও উল্লেখ নেই। এটা খুবই হতাশার।

যে যে জেলা-উপজেলায় শূন্য পদ নেই সেসকল জেলার প্রার্থীদের আবেদন করার দরকার নেই, সেটা সার্কুলারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। লিখিত পরীক্ষার ফল শূন্য পদের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হবে নাকি জাতীয় মেধা তালিকার ভিত্তিতে প্রকাশ করা হবে সে বিষয়টা স্পষ্ট করার উপর জোর দিয়েছেন তারা। লিখিত পরীক্ষার ফল নম্বরসহ প্রকাশের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

১৫তম নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করেই ১৬তম নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেয়ায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অনেকে দাবি জানিয়েছেন ১৫তম লিখিত পরীক্ষার ফল সংশোধন করে পুনরায় ফল প্রকাশের।এছাড়া উপজেলা ভিত্তিক তালিকা প্রকাশের। প্রিলিমিনারি, রিটেন ও ভাইভার নির্দিষ্ট পাশ করার নম্বর উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি শিক্ষার্থীদের।

বিষয়টি নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে-র সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন এনটিআরসিএ’র চেয়ারম্যান এস এম আশফাক হোসেন। তিনি বলেন: আমাদের স্ট্যান্ডার্ড এখন আগের থেকে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। আমাদের প্রার্থী চাহিদা ছিল ১৬ হাজার কিন্তু সখানে পাশ করেছে ১৩ হাজার। এখনও ৩ হাজার প্রার্থীর ঘাটতি রয়েই গেছে। কেউ পাস করলে কীভাবে তাকে আমরা ফেল করাবো? এ বিষয়টি আমার বোধগোম্য নয়। প্রার্থীরা হয়তো মনে করছে তারা অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। ৮০ থেকে ৮৫ নম্বর পাবে। কিন্তু কীভাবে তারা এটা বলছে বুঝতে পারছি না।

১৫তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার লিখিতের ফল প্রকাশের আগেই কেন ১৬তম নিবন্ধনের প্রজ্ঞাপন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: প্রতিবছর একটি করে পরীক্ষা নিতে হবে আমাদের। আমাদের নীতিমালায় এটা উল্লেখ করা আছে। ১৪তম নিবন্ধন নিয়ে মামলার কারণে বেশ কিছুদিন প্রজ্ঞাপন বন্ধ থাকায় আমি দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই ১৫তম’র প্রজ্ঞাপন জারি করি। এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই এর কার্যক্রম শেষ হবে। আশা করছি ২০২০ সাল নাগাদ এই জটটা ছুটে যাবে।

খাতা পুনঃমূল্যায়ন বিষয়ে তিনি বলেন: এনটিঅঅরসিএ’র বিধিমালা অনুযায়ী আইনত খাতা পুনঃমূল্যায়ন বা নম্বর দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে যারা চূড়ান্ত নিয়োগ পাবে তাদের মেধাতালিকার ক্রম ও নম্বরসহ প্রকাশ করা হবে।

পাস করার মানদণ্ড কী? এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন: একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের যদি প্রয়োজন হয় ১০০ জন প্রার্থী, সেখানে আমরা পাস করিয়েছি ১২০ জন। তবে কিছু কিছু সাবজেক্টে আমাদের যদি দরকার হয় ১০০ জন। সেখানে ১৪ জনও পাশ করেনি এমনটাও হয়েছে।

‘আগে যেমন ৪০ নম্বর পেয়ে পাস করতো প্রার্থীরা, সেক্ষেত্রে এখন কত নম্বর  পেয়ে পাস করতে হচ্ছে?’, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: কিছু কিছু সাবজেক্টে দেখা গেছে ৪০ নম্বর পেয়ে পাস করেছে। আবার কিছু সাবজেক্টে চাহিদা অনুযায়ী বেশি প্রার্থী ৪০ এর উপরে নম্বর পাওয়ায় সেখানে কিছুটা বেশি নম্বর পেয়ে পাস করতে হয়েছে প্রার্থীদের।

তবে চার বছরের অনার্স ও ১ বছরের মাস্টার্স শেষে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি (ভালো সিজিপিএ) পেয়ে পাশ করা প্রার্থীরা কেন এ পরীক্ষায় ফেল করছে? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। তবে আমি বলবো আমাদের স্ট্যান্ডার্ড এখন আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে।

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফল। এতে ১৩ হাজার ৩৪৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। স্কুল পর্যায়ে ১০ হাজার ৯৬৮ জন, স্কুল পর্যায়-২ এ ৭৭০ জন এবং কলেজ পর্যায়ে ১ হাজার ৬০৭ জন ।

১ লাখ ২১ হাজার ৬৬০ জন ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষায় ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন।

গত ২৬ ও ২৭ জুলাই ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রিলিমিনারিতে দেড় লাখ প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। লিখিত পরীক্ষায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬৬০ জন অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৯ মে ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হয়ে ১ লাখ ৫২ হাজার পরীক্ষার্থী। পাসের হার ছিল ২০ দশমিক ৫৩ ভাগ। উত্তীর্ণদের মধ্যে স্কুল পর্যায়ের ৫৫ হাজার ৫৯৬ জন, স্কুল পর্যায়-২ এর ৪ হাজার ১২৯ জন এবং কলেজ পর্যায়ের ৯২ হাজার ২৭৫ জন প্রার্থী। প্রিলিমনারিতে ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৩ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন।